Header Ads

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ। আমার ব্যক্তিগত ব্লগ সাইটে আপনাদর স্বাগতম

ইসলামী দাওয়াত ও কর্মনীতি

 

ইসলামী দাওয়াত ও কর্মনীতি

 

 সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী   




[পুস্তিকাটি মূলত ১৯৪৫ ইংরেজী সনের ১৯ শে এপ্রিল দারুল ইসলাম পাঠানকোটে অনুষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামীর বার্ষিক সম্মেলনে প্রদত্ত তকালীন আমীরে জামায়াতে সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদীর ভাষণ ]

 

আমাদের এই শূষ্ক, নীরস ও স্বাদহীন আন্দোলন শেষ পর্যন্ত লোকের মনে আশাতীত কৌতুহল এবং উসাহের সৃস্টি করিতে সমর্থ হইয়াছে দেখিয়া আমরা আল্লাহ তাআলার লাখ লাখ শুকরিয়া আদায় করিতেছিবস্তুত আমরা যে দাওয়াত লইয়া উঠিয়াছি, বর্তমান দুনিয়ার আন্দোলনের বাজারে উহা অপেক্ষা অচল পণ্য বোধ হয় আর একটি ও নাইউপরন্তু, আমরা যে কর্মনীত গ্রহণ করিয়াছি, তাহাতেও আন্দোলনকে তীব্র গতিতে সম্প্রসারিত করার এবং জনগণকে উহার দিকে আকৃষ্ট করিয়া তুলিবার জন্য বর্তমানকালে সাধারণত যে সব উপায় -উপকরণ গ্রহণ করা হয়, তাহার একটিও বর্তমান নাইসভার পর সভা করা, মিছিল বাহির করা, রকমারি শ্লোগান দ্বারা আকাশ-বাতাস মুখরিত করা, পতাকা উত্তোলন করা, গরম গরম বক্তৃতা দান প্রভৃতি কোন একটি জিনিসও আমাদের কর্মনীতিতে স্থান পায় নাই। * কিন্তু এতদসত্ত্বেও লক্ষ্য করেতেছি এবং ইহা দেখিয়া খোদার শোকরে হৃদয় অবনত হইয়া আসে যে, ধীরে ধীরে বহু সংখ্যক লোক আমাদের এই দাওয়াতের দিকে আকৃষ্ট হইতেছে, আমাদের এই নীরস সম্মেলনসমূহের দূরবর্তী স্থান হইতে দলে দলে লোক যোগদান করিতেছে আমাদের দৃষ্টিতে লোকদের আকর্ষণ নিশ্চিত সত্যের স্বাভাবিক আকর্ষণ ছাড়া আর কিছুই নহে কারণ আমাদের নিকট প্রকৃত সত্য ভিন্ন লোকদের আকর্ষণ করিবার আর কোন জিনিসই নাই

 

_________________________________________ *ঐ সময় একদিকে কংগ্রেসের অখণ্ড ভারত আন্দোলন ও অপরদিকে মুসলিম লীগের ভারত বিভাগ করিয়া পাকিস্তান কায়েমের আন্দোলনের প্রতিযোগিতা তীব্র আকার ধারন করেঐ সময় রাজনৈতিক হৈ-হাঙ্গামায় জামায়াত শরীক না হইয়া নীরবে দাওয়াত ও সংগঠনে আত্মনিয়োগ করে তাই জামায়াত তখন মিছিল ও অন্যান্য রাজনৈতিক তপরতা শুরু করে নাই _________________________________________

 

 

সম্মেলনের উদ্দেশ্য

বস্তুত কোন প্রদর্শর্নী কিংবা আলোড়ন সৃষ্টি করিয়া লোকদেরকে নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করা আমাদের সম্মেলনসমূহের কখনই উদ্দেশ্য নহেএই সম্মেলনের মারফতে আমাদের সদস্যগণ পরস্পর পরিচিত ও সংঘবদ্ধ হইবে, তাহাদের মধ্যে কোনরূপ অপরিচিতির ব্যবধান থাকিবে না, পরস্পর গভীরভাবে মিলিত হইবে, পারস্পারিক পরামর্শ ও সহযোগিতার উপায় উদ্ভাবন করিবে এবং নিজেদের মূল কাজকে সম্মুখের দিকে অগ্রসর করিবার জন্য বিপদ, সমস্যা ও বাধা-বিপত্তিসমুহ দুর করিবার পন্থা নির্ধারণ করিবে- ইহাই হইতেছে সাধারণত আমাদের সম্মেলনসমুহের উদ্দেশ্যএতদ্ব্যতীত আমাদের অতীতের কাজ যাচাই করা, দোষ-ত্রুটিসমূহ অনুধাবন করা এবং তাহা দূর করিবার জন্য চিন্তা করার অবসর লাভ করা ও আমাদের এই সম্মেলনের অন্যতম লক্ষ্যউপরন্তু আমাদের প্রতি সহানুভূতিশীল, আমাদের আদর্শ ও চিন্তাধারার সমর্থক কিংবা আমাদের কাজ সম্পর্কে সন্দিগ্ধ লোকদেরকে প্রত্যক্ষ্যভাবে আমাদের দাওয়াত এবং কাজ বুঝিবার জন্যই এই সম্মেলনে সুযোগ করিয়া দেওয়া হয়ফলে, আমাদের সত্যনীতি সম্পর্কে তাহাদের মন নিঃসন্দেহে সায় দিলে তাহারা আমাদের জামায়াতে যোগদান করিতে পারেনঅনেক সময় কেবল অসাক্ষা ও দূরত্বের দরুনই বহু প্রকারে ভ্রান্তিবোধের সৃস্টি হয়কাজেই তাহা দুর করিবার জন্য নৈকট্য, সাক্ষা, প্রত্যক্ষ আলাপ-আলোচনা ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপন (personal Contact) ভিন্ন কার্যকর উপায় আর কিছুই হইতে পারে নাআতএব আমরা এইজন্য খোদার শোকর আদায় করিতেছি এবং যাহারা নিজেদের সময় ও অর্থ ব্যয় করিয়া কেবল আমাদের এই কথা শুনিবার জন্য আমাদের সম্মেলনে যোগদান করিয়াছেন, তাহাদেরও ধন্যবাদ দিতেছিতাহাদের এই সত্যানুসন্ধিসাকে আমরা শ্রদ্ধা করিকারণ যেখানে সাহ সৃষ্টি করার সাধারণ ব্যবহৃত কোন উপাদানই বর্তমান নাই, তথায় তাহারা শুধু এই উদ্দেশ্যে আসিয়া থাকেন যে, খোদার মুষ্টিমেয় কয়েকজন বান্দাহ আল্লাহর নাম লইয়া যে কাজ শুরু করিয়াছেন, তাহা গভীর সূক্ষ্ণ দৃষ্টিতে যাচাই করিয়া দেখিবেন, বিচার করিবেন যে, কাজ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহরই জন্য কি নাএই সত্যানুসন্ধিসা মন ও মস্তিষ্কের নির্মলতা ও পরিচ্ছন্নতার সহিত হইলে তাহাদের এই চেষ্টাকে ব্যর্থ হইতে দিবেন নাবরং তিনি তাহাদেরকে নিশ্চয়ই সত্য পথের সন্ধান বলিয়া দিবেন তাহাতে কোন সন্দেহ নাই

এই সম্মেলনে এমন অনেক লোকই রহিয়াছেন, যাহারা আমাদের দাওয়াত, উদ্দেশ্য ও কর্মনীতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানিতে চাহেন, এই জন্য সর্বপ্রথম আমি এই বিষয়ে আলোচনা করিতে চাই

 

 

 

 

 

 

আমাদের দাওয়াত

আমাদের দাওয়াত সম্পর্কে সাধারণত বলা হয় যে, আমরা ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করার দাওয়াত দিয়া থাকিহুকুমতে ইলাহিয়া শব্দে স্বতঃই এক প্রকার ভুল ধারণর সৃষ্টি হয়- অনেকে আবার ইচ্ছা করিয়াই ইহাকে কেন্দ্র করিয়া ভুল ধারণা সৃষ্টি করিতে চেষ্টা করেসাধারণত লোকে মনে করে, কিংবা তাহাদেরকে বুঝাতে চেষ্টা করা হয় যে, ইসলামী রাষ্ট্র বলিতে একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা মাত্র বুঝায়আর বলা হয় যে, বর্তমান রাষ্ট্র ব্যবস্হার পরিবর্তে সেই বিশেষ রাজনৈতিক ব্যবস্হা প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্যতাহার পর যাহারাই এই রাষ্ট্র ব্যবস্হা প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করিবে, যেহেতু তাহারাই উহার পরিচালনভারও লাভ করিবে, সেহেতু খুব সহেজই বুঝনো হয় যে, আমরা হুকুমত দখল করিতে চাইঅতঃপর দ্বীনদারীর ওয়ায শুরু হইয়া যায়আমাদেরকে দুনিয়ার বা পার্থিব স্বার্থবাদী আখ্যা দেওয়া হয়অথচ মুসলমানদের তো দ্বীন- ইসলাম এবং পরকালের জন্যই কাজ করা দরকার, দুনিয়ার জন্য নহেদ্বিতীয়তঃ ইহাও বলা হয় যে, হুকুমত তো দাবী করার বস্তু নহে, ইহা তো ধার্মিক জীবন যাপনের ফলে খোদার তরফ হইতে উপহারস্বরূপই মানুষ লাভ করিয়া থাকেবস্তুত আমাদের সম্পর্কে এইসব কথাবার্তা অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত তত্ত্ব না বুঝিয়াই বলা হয় কোথাও বিশেষ চালাকীর সহিত ইহা প্রচার করা হয় শুধু এই উদ্দেশ্যে যে, আমাদেরকে না হইলেও খোদার অনেক বান্দাহকেই হয়তো এই উপায়ে সত্যের এই মহান আন্দোলন হইতে বিরত রাখা সম্ভব হইবেঅথচ আমাদের বই পুস্তক উদার ও মুক্ত দৃষ্টিতে পাঠ করিলে প্রত্যেকেই অতি সহজেই বুঝিতে পারেন যে, নিছক একটা রাস্ট্র-ব্যবস্হা প্রতিষ্ঠাই আমাদের উদ্দেশ্য নহেপ্রকৃতপক্ষে মানুষের সামগ্রিক জীবনে ইসলাম নির্ধারিত পরিপূর্ণ বিপ্লব সৃষ্টি করাই আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্যএই বিপ্লবের জন্যই আল্লাহ তাআলা নবী প্রেরণ করিয়াছেন তাহাদের আহবান ও আন্দোলনের ফলে সব নবীরই নেতৃত্বে এক উদ্দেশ্যকে পূর্ণ করা

আমাদের দাওয়াতকে সহজ ও সুস্পষ্ট ভাষায় পেশ করিতে হইলে ইহাকে নিম্নলিখিত তিনটি দফায় পেশ করা যায়ঃ

১. আমরা সাধারণত সকল মানুষকে এবং বিশেষভাবে মুসলমানদেরকে আল্লাহর দাসত্ব গ্রহণ করার আহবান জানাই
২. ইসলাম গ্রহণ করার কিংবা উহাকে মানিয়া লওয়ার কথা যাহারাই দাবী অথবা প্রকাশ করেন, তাহাদের সকলের প্রতি আমাদের আহবান এই যে, আপনারা আপনাদের বাস্তব জীবন হইতে মুনাফিকী ও কর্ম-বৈষম্য দূর করুন এবং মুসলমান হওয়ার দাবী করিলে খাঁটি মুসলমান হইতে ও ইসলামের পূর্ণ আদর্শবান হইতে প্রস্তুত হউন
৩. মানব-জীবনের যে ব্যবস্হা আজ বাতিলপন্থী ও ফাসিক কাফিরদের নেতৃত্বের আমূল পরিবর্তন করিতে হইবে এবং নেতৃত্ত্ব ও কর্তৃত্ত্ব আদর্শ ও বাস্তব উভয় ক্ষেত্রেই আল্লাহর নেক বান্দাহদের হাতে সোপর্দ করিতে হইবেউল্লিখিত তিনটি বিষয়ই যদিও সুস্পষ্ট, তবুও দীর্ঘকাল পর্যন্ত ইহার উপর ক্রমাগত ভুল ধারণা ও অবসাদ-উপেক্ষার আবর্জনা পুঞ্জীভূত হইয়াছে বলিয়া আজ কেবল অমুসলমানই নহে- মুসলমানদের নিকটও বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা অপরিহার্য হইয়া পড়িয়াছে

খোদার বন্দেগীর বিভিন্ন রকম অর্থ করা হয়কেহ মেন করে, মুখে মুখে খোদাকেখোদাএবং নিজেকে খোদার বান্দাহ মানিয়া লওয়াই যথেষ্ট নৈতিক, বাস্তব কর্মজীবনে এবং সমষ্টিগত ক্ষেত্রে খোদাকে না মানিলে এবং তাহার দাসত্ব স্বীকার না করিলেও কোনরূপ ক্ষতি নাইঅথবা খোদাকে অতিপ্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টিকর্তা , রেযেকদাতা এবং মাবুদ স্বীকার করিতে হইবে এবং বাস্তব কর্মজীবনের কর্তৃত্ব ও নেতৃত্বের ক্ষেত্র হইতে খোদাকে অপসারিত ও বেদখল করা অসংগত হইবে নাখোদার বন্দেগী সম্পর্কে আর একটি ধারনা এই যে, জীবনকে ধর্মীয় ও বৈষয়িক- এই দুইভাগে বিভক্ত করা চলে এবং কেবল ধর্মীয় জীবনে আকীদা-বিশ্বাস, ইবাদত ও হালাল-হারামের কয়েকটি শর্ত পালনের ব্যাপারে খোদার বন্দেগী করিলেই চলিবেকিন্তু বৈষয়িক ব্যাপারে তামাদ্দুন, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প- সাহিত্যের ক্ষেত্রে মানুষ খোদার বন্দেগী হইতে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকিবেএই ক্ষেত্রের জন্য হয় নিজেরা কোন নীতি রচনা করিয়া লইবে, কিংবা অপর লোকদের রচিত নীতি অবলম্বন করিবে

খোদার বন্দেগী সম্পর্কে সাধারণ প্রচলিত এই সমস্ত ধারণাকেই আমরা ভ্রান্ত মনে করি এবং ইহা নির্মূল করতে চাইকাফিরী জীবন-ব্যবস্হার বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই যতখানি, ততখানি কিংবা ততোধিক তীব্রতার সহিত বন্দেগীর এই ভুল ধারণাসমূহের বিরুদ্ধেও আমাদের সংগ্রাম কারণ, উল্লিখিত ধারণসমূহে দ্বীন ইসলামের মূল ভিত্তি এবং রূপকেই সম্পূর্ণ বিকৃত করিয়া দেওয়া হইয়াছেআমাদের মনে কুরআন মজীদ এবং উহার পূর্ববর্তী সমস্ত আসমানী গ্রন্হ, শেষ নবী এবং পৃথীবির বিভিন্ন অংশে প্রেরিত অন্য নবীগণ এক বাক্যে খোদার দাসত্ব গ্রহণ করার পর যে আহবান জানাইয়াছেন, তাহার অর্থ এই যে, মানুষ খোদাকে পূর্ণরূপে ইলাহ, রব, মাবুদ, শাসক, মালিক, মনিব, পথপ্রদর্শক, আইন রচয়িতা, হিসাব গ্রহণকারী এবং প্রতিফলদাতা মানিবে এবং নিচের সমগ্র জীবনকে ব্যক্তিগত (private), সামাজিক, নৈতিক, ধর্মীয়, তামাদ্দুনিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক ও আদর্শমূলক ব্যাপারসমূহকেও পূর্ণরূপে খোদার বন্দেগীর ভিত্তিতেই সুসম্পন্ন করিবেকুরআন মজীদে( ) পূর্ণরুপে ইসলামের মধ্যে দাখিল হওবলিয়া এই কাজেরই নির্দেশ দেওয়া হইয়াছেঅর্থা নিজেদের জীবনের কোন একটি দিক বা বিভাগকেই খোদার বন্দেগীর বাহিরে রাখিতে পারিবে না পরিপূর্ণ সত্ত্বা লইয়া খোদার গোলামী ও দাসত্ব কর, জীবনের কোন একটি দিক বা কোন একটি কাজকেও তোমরা খোদার বন্দেগী হইতে মুক্ত রাখিও না, খোদার নির্দেশ ও বিধানকে পরিত্যাগ করিয়া, স্বাধীন ও স্বেচ্ছাচারী হইয়া অথবা কোন স্বাধীন স্বেচ্ছাচারী মানুষের অনুসারী ও অনুগামী হইয়া চলিও নাবস্তুত খোদার বন্দেগীর এই অর্থই আমরা প্রচার করিয়া থাকিএইরূপ বন্দেগী কবুল করার জন্য আমরা মুসলিম সকল মানুষেকই আহবান জানাইয়া থাকি

মুনাফিকীর মূলকথা

দ্বিতীয়তঃ আমরা এই দাওয়াতও দেই যে, যাহারা ইসলামের অনুসরণ করিয়া চলার দাবী করে, কিংবা যাহারা ইসলাম গ্রহণ করিয়াছে, তাহারা যেন বাস্তব জীবনে মুনাফিকী নীতি পরিত্যাগ করে এবং নিজেদের জীবনকে যেন আভ্যন্তরীণ বৈষম্য ও কর্মীয় বৈষম্য (Inconsistencies) হইতে পবিত্র রাখেমুনাফিকী নীতিবলিতে বুঝায় সেই অবস্হাকে, যখন মানুষ নিজের ঈমান ও দ্বীন এর সম্পূর্ণ বিপরীত ধরনের জীবন ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠিত করিতে আদৌ চেষ্টা করে না বরং সাম্প্রতিক ফাসিকী ও খোদাদ্রোহীমূলক জীবন ব্যবস্থাকে নিজের অনূকূল মনে করিয়া উহাতে নিজের মঙ্গলময় ভবিষ্যতরচনার চিন্তায় মশগুল হয়তাহা পরিবর্তনের চেষ্টা করিলেও তাহার উদ্দেশ্য ফাসিকী জীবন-ব্যবস্থার পরিবর্তন করিয়া দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠিত করা নহে, বরং এক ধরনের ফাসিকী রাস্ট্র-ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা করাই তাহার উদ্দেশ্য হইয়া থাকে আমাদের মতে এই কর্মণীতি সম্পূর্ণ মুনাফিকী কর্মনীতি ছাড়া আর কিছুই নহেকারণ এক প্রকার জিবন-ব্যবস্থার প্রতি ঈমান রাখা এবং কার্যত উহার বিপরীত ধরণের জীবন-ব্যবস্হার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা সুস্পষ্টরূপে পরস্পর বিরোধি ব্যাপারনিষ্ঠাপূর্ণ ঈমানের পরিচয় এই যে, যে জীবন ব্যবস্হার প্রতি ঈমান আনা হইবে উহাকেই বাস্তব জীবনের বিধান ও আইন হিসাবে চালু করিতে হইবে এবং এই জীবন ব্যবস্হা অনুযায়ী বাস্তব জীবন যাপনের পথে যত বাধা প্রতিবন্ধকতাই আসুক না কেন, উহার প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই আমাদের প্রাণ কাতর ও ব্যাকুল হইয়া উঠিবেপ্রকৃত ঈমান উহার বিকাশ পথেই এই ধরনের সামান্যতম বাধা বরদাশত করিতেও প্রস্তুত হয় নাআর সমগ্র দ্বীনকে বিপরীত ধরনের রাষ্ট্র ব্যবস্হার অধীন থাকিতে দেখার এবং তাহা সহ্য করার তো কোন প্রশ্নই উঠিতে পারে নাকারণ, এই অবস্থায় তাহার দ্বীন এর কোন অংশেরই বাস্তবায়ন সম্ভব নহেকোন কোন দেশে বিজয়ী ও প্রতিষ্ঠিত জীবন ব্যবস্হা ইসলামের বিশেষ কয়েকটি অংশকে অক্ষতিকর মনে করিয়া অনুগ্রহ স্বরূপ চলিতে দেয় বটে, কিন্তু মানব জীবনের অন্যান্য সমগ্র ব্যাপারই দ্বীন-ইসলামের বিপরিত নিয়ম-নীতি অনুযায়ী চলিয়া থাকেএই অবস্হায় ও সেখানে ঈমানের কোনই ক্ষতি হয় না বলিয়া যাহারা মনে করে, তাহাদের ভ্রান্তি সুস্পষ্টসেখানে কাফিরী ব্যবস্হাকে এক স্হায়ী নিয়তি মনে করিয়াই অন্যান্য কাজ সম্পর্কে চিন্তা করা হয়ফিকাহ শাস্ত্রের বাহ্যিক দৃষ্টিতে এই ধরনের ঈমানের যত মূলই হোক না কেন, কিন্তু দ্বীন-ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত মুনাফিকী ও এই ধরনের ঈমানের মধ্যে কোন পাথর্ক্য নাইকুরআনের অসংখ্য আয়াতও ইহাকে মুনাফিকী বলিয়াই অভিহিত ও প্রমাণিত করেপূর্বোক্ত অর্থ অনুযায়ী যাহারাই খোদার বন্দেগী কবুল করার প্রতিশ্রুতি দিবে, তাহাদের সকলেরই জীবনকে এইরূপ মুনাফিকী হইতে পবিত্র করিয়া তোলাই হইল আমাদের এই প্রচেষ্টার লক্ষ্য; খোদার বন্দেগীর সঠিক ধারনা অনুযায়ী ঐকান্তিক নিষ্ঠার সহিতই অবিশ্রান্তভাবে আমাদের এই চেষ্টা চালাইয়া যাইতে হইবেকারণ আমরা চূড়ান্তভাবে এই সিদ্ধান্ত করিয়াছি যে, আল্লাহ তাআলা তাঁহার নবীদের মারফতে যে জীবন পদ্ধতি, আইন-কানুন এবং তামাদ্দুন, নৈতিক চরিত্র, সমাজ, রাজনীতি, অথর্নীতি এবং চিন্তা ও কর্মের যে বিধান প্রেরণ করিয়াছেন, আমরা আমাদের পরিপূর্ণ জীবনে তাহাই অনুসরণ করিয়া চলিব এবং এক মুহুর্তের জন্য জীবনের কোন একটি কাজকেও- কোন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ব্যপারেও- খোদার দেওয়া সত্য জীবন বিধানের পরিবর্তে অপর কোন আদর্শ ও নীতির বিন্দুমাত্র প্রভাবও স্বীকার করিব নাবাতিল জীবন ব্যবস্হার সামান্য ব্যাপারে, সেখানে উহাতে সন্তুষ্ট হওয়া, উহার প্রতিষ্টা ও স্হিতির চেষ্টায় অংশগ্রহণ করা কিংবা এক প্রকারের বাতিল ব্যবস্হার পরিবর্তে অন্য এক প্রকারের বাতিল বিধানকে প্রতিষ্ঠিত করিতে চেষ্টা করা যে প্রকৃত ঈমানের কত বিপরীত, তাহা কাহারও অজ্ঞাত থাকা উচিত নহে

কমীর্য় বৈশাদৃশ্যের তত্ত্বকথা

মুনাফিকীর পর দ্বিতীয়ত আমরা যে জিনিসকে নতুন-পুরাতন সকল মুসলমানের জীবন হইতে দুর করিতে বলি তাহা হইতেছে কর্মীয় বৈসাদৃশ্য- কথা ও কাজের অসামঞ্জস্যমানুষ মুখে মুখে যে আদশের্র প্রতি ঈমান গ্রহণের দাবী করে, উহার বিপরীত কাজ করাকেই বলা হয় অসামঞ্জস্যবিভিন্ন নীতি অনুসরণ করাকেও অসামঞ্জস্য বলা হয়কাজেই কেহ যদি সমগ্র জীবনকে খোদার বন্দেগীর অনুসারী করার দাবী করে, তবে চেতনা থাকিতে জীবনে কোন একটি কাজও এই বন্দেগীর বিপরীত করা কোনক্রমেই উচিত হইতে পারে নামানবীয় দুর্বলতার কারনে কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটিলে সঙ্গে সঙ্গেই নিজের ত্রুটি স্বীকার করিয়া খোদার বন্দেগীর দিকে প্রত্যাবর্তন করিবেসমগ্র জীবনকে খোদার দাসত্ব স্বীকার ভিত্তিতে পরিপূর্ণ সামঞ্জস্যের সহিত গঠন করা ঈমানের ঐকান্তিক দাবী বহুরূপী হওয়াতো দূরের কথা, প্রকৃত ঈমান দ্বিরূপী হওয়াও বরদাশত করে না আমরা যদি একদিকে খোদা, পরকাল, ওয়াহী, নবুয়াত এবং শরীয়তকে মানিয়া চলার দাবী করি, আর অপরদিকে বৈষয়িক স্বার্থ, সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্ব লাভের জন্য বস্তুবাদি, খোদা ও পরকালের প্রতি অবিশ্বাস সৃষ্টিকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে শিক্ষালাভের জন্য যাই; এইরূপ শিক্ষাব্যবস্হা প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করি ও অপরকেও সেই জন্য উসাহিত করি, তবে আমাদের দৃষ্টিতে ইহা বহুরূপী নীতি ভিন্ন আর কিছুই নহেএকদিকে খোদার শরীয়াতের প্রতি ঈমান গ্রহণের দাবী করি, আর সেই সঙ্গে খোদার দুশমনদের রচিত আইনের ভিত্তিতে স্হাপিত আদালতের জজ ও উকিল হইতে এবং সেই আদালতের বিচারকের উপর সত্য-মিথ্যা, হক, না-হক নির্ধারণে একান্তভাবে নির্ভর করি; একদিকে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ি,অপরদিকে মসজিদ হইতে বাহির আসিয়াই নিজেদের জীবনে লেন-দেনের ব্যাপারে, জীবিকা নির্বাহের উপায় অবলম্বনে, বিবাহ-শাদীতে, মীরাস বণ্টনে, রাজনৈতিক আন্দোলন সমূহে এবং নিজেদের সকল প্রকার পার্থিব খোদাকে এবং খোদার শরীয়তকে ভুলিয়া গিয়া কোথাও নিজেদের নফসের দাসত্ব করি, কোথাও বংশীয়নিয়ম প্রথা, কোথাও সমাজের রীতি-নীতি এবং কোথাও খোদাদ্রোহী শাসকদের দাসত্ব করি; একদিকে আমরা খোদার নিকট এই বলিয়া বারবার প্রতিশ্রুতি দেই যে, আমরা তোমারই বান্দাহ-আমরা তোমারই ইবাদাত ও দাসত্ব করি, আর অপরদিকে আমরা এমন সকল মূর্তিরপূজা করি- যাহার সহিত আমাদের কিছু না কিছু স্বার্থ, ভালবাসা, দরদ, মনের সংস্কার, সুযোগ-সুবিধা ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট রহিয়াছে, তবে ইহা সবই কর্মীয় বৈষম্য, অসামঞ্জস্য এবং মুনাফিকী ভিন্ন আর কিছুই নহেবর্তমান মুসলমানদের জীবনে যে এই ধরনের অসংখ্য বৈশাদৃশ্য বর্তমান রহিয়াছে, তাহা চক্ষুষ্মান ব্যক্তিই অস্বীকার করিতে পারে নআমার মতে মুসলিম জাতির ইহা এক মারাত্নক রোগ, যাহা ইহার চরিত্র ও প্রকৃতি এবং দ্বীন ও ঈমানকে ভিতর হইতেই ঘূণের ন্যায় অন্তঃসারশূন্য করিয়া দিতেছে বাস্তব জীবনের প্রতোকটি ক্ষেত্রেই আজ যে তাহাদের দূর্বলতা প্রকট হইয়া উঠিয়াছে, তাহারও মূল কারণ হইতেছে এই কর্মীয় বৈষম্য ও বৈসাদৃশ্যদীর্ঘকাল হইতে মুসলিম জাতিকে এই বলিয়া প্রবোধ দেওয়া হইতেছে যে, মুখ দ্বারা তাওহীদ ও নবুয়াতের সাক্ষ্য দিলে এবং নামায, রোযা ইত্যাদি কয়েকটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করিলেই সকল কতর্ব্য আদায় হইয়া গেল, অতঃপর জীবনের অন্যান্য সকল কাজে দ্বীন বিরোধী ও ঈমান বিরোধী কর্মনীতি অবলম্বন করিলেও তোমাদের ঈমানের একবিন্দু ক্ষতি হইবে না, আর তোমাদের মুক্তিলাভের ব্যাপারেও কোন আশঙ্কা দেখা দিবে নাএই সুবিধা দানের (Allowance) সীমা ক্রমশ এতদুর সম্প্রসারিত হইয়া পড়িল যে, শেষ পর্যন্ত মুসলমান হওয়ার জন্য নামায পড়াও আর কোন অনিবার্য শর্ত রহিল নামুসলমানদের মধ্যে এই ধারনাও বদ্ধমূল করিয়া দেওয়া হইল যে, ঈমান ও ইসলামের স্বীকারোক্তি হইলেই যথেষ্ট, কার্যত সমস্ত জীবন ইসলামের সম্পূর্ণ বিপরীত আদর্শে চলিলেও কোন ক্ষতি নাইইহারই ফলে আজ দেখিতেছি সকল প্রকার ফাসিকী, কাফিরী, পাপ, নাফরমানী, যুলুম ও স্পষ্ট খোদাদ্রোহিতাকে অবলীলাক্রমে ইসলামের নামে চালাইয়া দেওয়া হইতেছে মুসলমানগণ বর্তমানে যে পথে তাহাদের সময় শ্রম, ধন-মাল, শক্তি-সামর্থ্য, যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা এবং জীবন ও প্রাণ একান্তভাবে নিযুক্ত করিতেছে, যেসব উদ্দেশ্য ও লক্ষের পশ্চাতে ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগতভাবে চেষ্টা-সাধনা করিতেছে, তাহার অধিকাংশই যে তাহাদের ঈমানের সম্পূর্ণ বিপরীত, এইটুকু কথাও আজ মুসলমানরা অনুধাবন করিতে সমর্থ হন নাবস্তুত এই অবস্তা বর্তমান থাকিতে অমুসলিমদের ইসলাম গ্রহণেরও কোন সাথর্কতা নাইকারণ এই লবনের খনিতে বিচ্ছিন্নভাবে যত লোকই প্রবেশ করিবে, তাহারা লবনের সহিত মিশিয়া একাকার হইয়া যাইবেকাজেই এই সব বৈষম্য ও কর্মীয় বৈসাদৃশ্য হইতে জীবনকে পবিত্র করার জন্য মুসলমানকে আহবান জানান আমাদের মূল দাওয়াতের একটি অবিচ্ছেদ্য ও গুরুত্বপূর্ণ অংশপ্রত্যেক ঈমানদার ব্যক্তিকেই আমরা সম্পূর্ণ একমুখী একনীতির অনুসারী ও একই আদর্শবাদী হইতে এবং ঈমান ও ইসলামী জীবন ধারার বিপরীত সকল প্রকার কাজ-কর্মের সহিত সম্পর্ক ছিন্ন করিতে না পারিলে, তাহা করিবার জন্য অবিশ্রান্ত চেষ্টা ও সাধনা করিতে আহবান জানাইঅনুরূপভাবে আমরা ঈমানের সকল দাবীকেই গভীর ও সুস্পষ্টরূপে অনুধাবন করিতে এবং তাহা পূরণ করিতে প্রস্তুত থাকার জন্য প্রত্যেক ঈমানদার ব্যক্তিকেই বলিয়া থাকি

 

 

 

 

 

 

নেতৃত্বে মৌলিক পরিবতর্নের আবশ্যকতা

আমাদের ইসলামী দাওয়াতের তৃতীয় দিক হইতেছে নেতৃত্বে আমূল পরিবর্তন সৃষ্টির সাধনাইতঃপূর্বে যে দুইটি বিষয়ের ব্যাখ্যা করিয়াছি, এই তৃতীয় বিষয়টিকে উহার অনিবার্য ফল হিসাবেই গ্রহন করিতে হয়আমাদের নিজেদেরকে এক খোদার দাসত্বের নিকট সোপর্দ করিয়া দেওয়া এবং এই ব্যাপারে কোন প্রকার মুনাফিকী ও বৈসাদৃশ্যের ফাঁক না রাখিয়া সম্পূর্নরূপে একনিষ্ট হওয়ার চেষ্টা করিতে হইলে অনিবার্যরূপে আমাদেরকে বর্তমান জীবন ও রাষ্ট্র ব্যবস্হায় বিপ্লব সৃষ্টির জন্য চেষ্টা করিতে হইবেবর্তমানে আমাদের জীবন ও রাষ্ট্র ব্যবস্হা কুফর, নাস্তিকতা, শিরক, ফাসিকী ও অসচ্চরিত্রতার ভিত্তিতে স্হাপিত রহিয়াছে ইহার পরিকল্পনা রচনাকারী, চিন্তাশীল এবং কর্মপরিচালক রাষ্ট্রনীতিবিদগণ নির্বিশেষে খোদা এবং তাহার বিধানকে অমান্য করিতেছেবস্তুত কতৃত্ব ও নেতৃত্ব যতদিন পর্যন্ত এইসব লোকের করায়ত্ত থাকিবে জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য, শিক্ষা-দীক্ষা, প্রচার-বেতার, আইন রচনা ও জারি করা অর্থ-বিভাগ, ব্যবসায়-শিল্প, কৃষি বিভাগ, রাষ্ট্র পরিচালনা, ব্যবস্হাপনা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইত্যাদি সকল ব্যাপারে ও প্রত্যেকটি জিনিসেরই মূল চাবিকাঠি যতদিন ইহাদের হাতে থাকিবে, ততদিন পর্যন্ত দুনিয়াতে খাঁটি মুসলমানের ন্যায় জীবন যাপন করা এবং খোদার দাসত্বকে জীবনের আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করা কেবল কার্যতই কঠিন নহে, ভবিষ্যত বংশধরদেরকে ইসলামের প্রতি বিশ্বাসী রাখিয়া যাওয়াই সম্পূর্ণরূপে অসম্ভব ব্যাপারএতদ্ব্যতীত খোদার সন্তোষ এবং বিধান অনুযায়ী দুনিয়া হইতে ধ্বংস ও বিপর্যয়মূলক অবস্হা দূর করিয়া শান্তি ও নিরাপত্তা এবং স্বস্তি ও স্বাচ্ছন্দের প্রতিষ্টা করিতে চেষ্টা করা খোদার প্রত্যেক নিষ্ঠাবান বান্দাহরই প্রদান কর্তব্যকিন্তু দেশ ও রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব যতদিন পর্যন্ত খোদার স বান্দাহদের হাতে অর্পিত না হইবে, ততদিন পর্যন্ত এই বিরাট ও মহান উদ্দেশ্য কিছুতেই লাভ হইতে পারে নাবস্তুত ফাসিক-ফাজির, খোদাদ্রোহী এবং শয়তানের দাসানুদাসগণ বিশ্বের নেতা, ব্যবস্হাপক ও পরিচালক থাকিলে যুলুম, অত্যাচার, অশান্তি, বিপর্যয়, নৈতিক ভাঙ্গন এবং ব্যাপক অধঃপতনের সম্পূর্ণ বিপরীতঅতএব আমরা মুসলিমহইলে দুনিয়ার বুক হইতে পথভ্রষ্ট নেতৃবৃন্দের নেতৃত্ব চিরতরে খতম করিয়া দেওয়া এবং কুফর ও শিরকের প্রাধান্য চূর্ণ করিয়া সত্য ও সঠিক জীবন-ব্যবস্হা দ্বীন-ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা ও সাধনা করা আমাদের অপরিহার্য কর্তব্য হইয়া পড়ে

 

 

নেতৃত্বের পরিবতর্ন কিরূপে হইবে

কিন্তু শুধু চাহিলে বা ইচ্ছা করিলেই নেতৃত্বের এই পরিবর্তন বাস্তবায়িত হইতে পারে নাআল্লাহ পৃথিবীর সুব্যবস্হার উপর নিশ্চয়ই অধিক গুরুত্ব আরোপ করেন এবং বিশ্ব পরিচালনা ও ব্যবস্হার জন্য কিছু না কিছু যোগ্যতা, শক্তি এবং বৈশিষ্ট্যের প্রয়োজন রহিয়াছেতাহা যথাযথভাবে অর্জিত না হইলে মানুষের কোন দলই বিশ্ব-পরিচালনার গুরুদায়িত্ব নিজ হাতে লইতে এবং তাহা সঠিকভাবে চালাইয়া যাইতে পারে নাখোদার নেক বান্দাহদের কোন সুসংগঠিত দল যদি বিশ্ব-পরিচালনার যোগ্য না থাকে, তবে খোদার বিধান অনুযায়ী অঈমানদার অস লোকদের হাতেই দুনিয়ার ব্যবস্হাপনা ও পরিচালনার কর্তত্ব ন্যস্ত করা হয়কিন্তু এমন একটা দল যদি বাস্তবিকই বর্তমান থাকে, যাহাদের খাঁটি ঈমান আছে, যাহারা প্রকৃত স এবং যাহাদের বিশ্ব-পরিচালনার জন্য অপরিহার্য গুণাবলী, শক্তি ও কর্মদক্ষতা কাফিরদের অপেক্ষা বেশী আছে, তবে মনে রাখিতে হইবে যে, খোদার বিধান কখনও যালিম নহে- বিপর্যয়কামীও নহেঅতএব এমতাবস্হায় বিশ্বের নেতৃত্ব ফাসিক ও কাফিরদের হাতেই থাকিয়া যাইবে, এই ধারণা কিছুতেই করা যায় নাকাজেই দুনিয়ার কর্তত্ব ফাসিক ও কাফিরদের হাত তইতে স ঈমানদার লোকদের হাতে শুধু সোপর্দ করাই আমার উদ্দেশ্য নহে, বরং সক্রিয়ভাবে ঈমানদার ও সলোকদের একটি আদর্শ দল গঠন করাও আমাদের প্রধান লক্ষ্যআমাদের দাওয়াত এই যে, ঈমানদার ও সালেহ লোকদের এমন একটি দল ও সংগঠন করা হউক, যাহারা শুধু ঈমানের দিক দিয়াই মজবুত হইবে না, ইসলামের নিষ্ঠাবান অনুসারীই হইবে না, তাহাদোর ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত চরিত্রই কেবল পবিত্র ও পরিশুদ্ধ হইবে না, বরং সেই সঙ্গে নিষ্ঠার সহিত বিশ্বের বাস্তব জীবনধারা, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার তুলনায় তাহারা অনেকগুণে শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় দিবে

 

 

 

 

 

 

 

 

বিরুদ্ধতা ও উহার কারণ

আমাদের উদ্দেশ্য সংক্ষেপে ইহাইএই দিকেই আমরা বিশ্বের অধিবাসীদের আহবান জানাইয়া থাকিকিন্তু বড়ই বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, এই আন্দোলণের সর্বপ্রথম বিরুদ্ধতা হইয়াছে মুসলমানদের তরফ হইতেঅমুসলিমগণ- যাহারা এই আন্দোলনের বিরোধী হইতে পারে, আজ পর্যন্ত ইহার বিরুদ্ধে কোন কথাই বলে নাই, কোথাও কার্যত কোন বিরুদ্ধতা কেহ করেও নাইভবিষ্যতেও এইরূপ অবস্হা বর্তমান থাকিবে, কিনা, তাহা বলিতে পারি না; আর কতদিন পযর্ন্ত এই অবস্হা বর্তমান থাকিবে, তাহা অনুমান করাও সম্ভব নহেকিন্তু তবুও আমাদের উপরিউক্ত দাওয়াত শ্রবণ করিয়া নাক সিটকানো, ইহাকে বিপদের পূর্বাভাষ মনে করা এবং উহার বিরুদ্ধতার জন্য সম্মুখে অগ্রসর হওয়া প্রভৃতি কোন একটি কাজও আজ পর্যন্ত অমুসলিমগণ করে নাই- করিয়াছে আমাদের মুসলমান ভাইগণসম্ভবত এই ধরনের অবস্হায়ই আহলে কিতাব- ইহুদী-নাসারাদের বলা হইয়াছিলঃ( ) তোমরাই সবর্প্রথম ইহার অমান্যকারী হইও না।‌

হিন্দু, শিখ এবং ইংরেজদের সহিত এই বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করিয়াছিআমাদের কথাবার্তা বিস্তারিতভাবে শুনিয়া কিংবা আমাদের বই-পুস্তুক পাঠ করিয়া তাহাদের একজন লোকও আজ পর্যন্ত ইহাকে সত্য নহেবলে নাইকিংবা ইহার বিরুদ্ধতা করার প্রয়োজনীয়তাও তাহারা প্রকাশ করে নাইঅনেক অমুসলিম এতদূর বলিয়াছি যে, ইসলামের দাওয়াত যদি এই দেশে অনেক আগেই পেশ করা হইত এবং বহিরাগত ও স্হানীয় সবল মুসলমানই যদি ইহাকে কায়েম করিতে চেষ্টা করিতেন, তবে দেশের অবস্হা সম্পূর্ণ ভিন্নরূপ হইতে পারিতঅনেক অমুসলিম এতদূর বলিয়াছি যে, কোন সমাজ বা দল যদি ঐকান্তিক নিষ্ঠার সহিত এই আদর্শ অনুযায়ী কাজ করিত, তাহার জীবন ও মৃত্যু যদি এই উদ্দেশ্যের জন্যই উসর্গীকৃত হইত, তবে অমুসলিমগণ ইহার অন্তর্ভুক্ত হইতে কোনরূপ দ্বিধা সংকোচ করিত না এতদসত্ত্বেও সর্বপ্রথম আমাদের বিরুদ্ধতা করিবার জন্য মুসলিমগণই অত্যধিক পর হইয়া উঠিয়াছেআমাদের বিরুদ্বে কুসা রটনায়, নানাবিধ ভিত্তিহীন অভিযোগ উত্থাপনে ইহারাই অগ্রসর হইয়াছেআবার মুসলমানদের মধ্যেও অধিক পরতা দেখাইতেছে ধর্মপন্হী দলসর্বাপেক্ষা মজার ব্যাপার এই যে, আমাদের উদ্দেশ্য ও দাওয়াতকে আজ পর্যন্ত কেহই বাতিল বা সত্য নহেবলিবার সাহস করে নাইস্বম্ভবত ইহার একমাত্র কারণ এই যে, আমাদের দাওয়াত ও আন্দোলনের উপর সম্মুখ দিক হইতে আক্রমণ (FRONTAL ATTACK) করা কাহারও পক্ষেই সম্ভব নহেএই জন্যই কখনো পশ্চা দিক হইতে, কখনো ডান দিক আর কখনো বাম দিক হইতে ইহার উপর আক্রমণ করা হয়কখনো বলা হয়ঃ কথা তো ঠিক, তাহাতে সন্দেহ নাই; কিন্তু আন্দোলনকারীগণের মধ্যে এই দোষ বা ত্রুটি রহিয়াছেকেহ বলে, ইহারই সত্যতা অনস্বীকার্য, তবে এইরূপ আন্দোলন পরিচালনার জন্য সাহাবাদের ন্যায় লোকদেরই দরকার আর বতর্মানে তাহাদেরকে কোথায় পাওয়া যাইবে? কখনো বলা হয়, ইহা নিঃসন্দেহে ইসলামেরই দাওয়াত, তবে এই যুগে ইহা আদৌ চলিতে পারে নাকেহ বলে এই দাওয়াতের সত্যতা সম্পর্কে কেহ টু- শব্দটি করিতে পারে না, কিন্তু মুসলমানদের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্হার পরিপ্রেক্ষিতে ইহা গ্রহণ করা তাহাদের পক্ষে বিপজ্জনক হইবেএখানেই শেষ নহে, মুসলমানদের মধ্য হইতে খোদার কোন বান্দাহ যদি আমাদের এই দাওয়াত কবুল করেন এবং নিজের জীবনক্ষেত্র হইতে প্রকৃত মুনাফিকী ও কর্মীয় বৈসাদৃশ্য দূর করিতে যত্নবান হন, সমগ্র জীবনকেই খোদার বন্দেগীর অধীন করিয়া দেওয়ার সিদ্ধান্ত করেন, তবে তাহার ভাই পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবই সর্বপ্রথম তাহার বিরুদ্ধতা করার দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ হয়অনেক ধার্মিক ও মুত্তাকী ও এমন দেখা গিয়াছে, যাহাদের কপালে সিজদার চিহ্ন পড়িয়াছে, ধর্ম সংক্রান্ত আলোচনাই যাহাদের রসনা চব্বিশ ঘন্টা ব্যস্ত থাকে, তাহারাও তাহার বিরুদ্ধতা করিতে বিন্দুমাত্র সংকোচবোধ করে নাতাহাদের পুত্র, ভ্রাতা কিংবা কোন আত্মীয় এই আন্দোলনে যোগদান করুক ইহা আদৌ সহ্য করিতে প্রস্তুত নহেবস্তুত আমাদের এই আন্দোলনের বিরোধিতা সর্বপ্রথম মুসলমানদের করা, তাও আবার দুরিয়ার লোকদের অপেক্ষা দ্বীনদার লোকরাই বেশী- ইহা এক মারাত্মক রোগের পরিচয় সন্দেহ নাইএই রোগ যদিও চাকচিক্যপূর্ণ বহিরাবরণে আচ্ছাদিত ছিল, কিন্তু ইহার প্রাচীনত্ব সম্বন্ধে কোন সন্দেহ নাইআমরা যদি দাওয়াতকে নিছক একটি জ্ঞান ও গবেষণামূলক আন্দোলন হিসাবে পেশ করিতাম এবং এই উদ্দেশ্যকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত করিবার চেষ্টা করিতে লোকদের আহবান জানাইতাম, তবে আমরা বলিতে পারি যে আমাদের এই কাজের বিরুদ্ধতা না হইয়া চতুর্দিক হইতে ইহার প্রশংসা ও ধন্যবাদের পুষ্প বর্ষিত হইতখোদা ছাড়া অপর কাহারও দাসত্ব করা উচিত কিংবা মুসলমানদের মুনাফিকী ও ঈমান বিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত থাকা উচিত অথবা মানব জীবনের কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব স মুসলমানদের হাতে নহে- কাফিরদেরই করায়ত্ত থাকা উচিত- খোদার শরীয়াতের বদলে কাফিরী আইন দুনিয়ায় চলা উচিত- এই সব কথা কি কোন মুসলমান স্বীকার করিতে পারে? কিন্তু আমি পূর্ণ দৃঢ়তার সহিত বলিতে পারি, আজ পর্যন্ত আমরা যত কথাই বলিয়াছি, তাহার একটিও নিছক বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হিসাবে পেশ করি নাই, বরং সেই সঙ্গে তদানুযায়ী বাস্তব কাজেরও আহবান জানাইয়াছিযদি তাহা না করিতাম, শুধু একটি তত্ত্ব হিসিবেই তাহা পেশ করিতাম, তবে একজন মুসলমানও উহার বিরুদ্ধে টু- শব্দটি করিতে সাহস পাইত নাকিন্তু ব্যাপার এই যে, আমরা তাহা করিতে পারি না আমাদের দাওয়াত তো ঈমানের দৃষ্টিতে প্রত্যেক সত্যকে প্রথমত আমাদের নিজেদের জীবনে বাস্তবায়িত করা এবং পরে আমাদের বেষ্টনীতে ও সমগ্র পৃথিবীতে কার্যত কায়েম করাঐতিহাসিক দৃষ্টিতে দেখিলে বলা যায়, ইতঃপূর্বে হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর জীবনেও ঠিক এই ধরনেরই পরিস্হিতির উদ্ভব হইয়াছিলজাহিলী আরবের কাব্য- সাহিত্য সম্পর্কে অভিজ্ঞ প্রত্যেক ব্যক্তিই স্বীকার করিবেন যে, হযরতের উপস্হাপিত তাওহীদ ও নৈতিক বিধান আরব দেশে কিছুমাত্র নতুন জিনিস ছিল নাঅনুরূপ তাওহীদবাদী মতবাদ ও চিন্তাধারা জাহিলী যুগের অসংখ্য কবি এবং বক্তাও পেশ করিয়াছিল, ইসলামী নৈতিকতার অধিকাংশ কথা তাহারাও বলিয়াছিল কিন্তু পার্থক্য ছিল এই যে, নবী করীম (সা.) নির্ভেজাল ও অবিমিশ্র সত্যকে একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্হা হিসাবে পেশ করিয়াছিলেন এবং প্রকৃত তাওহীদের বিপরীত ভাবধারাকে বাস্তব জীবন ক্ষেত্র হইতে দূর করিয়া দিয়া সমগ্র জীবনকে এই তাওহীদের ভিত্তিতে গঠন করার আহবান জানাইয়াছিলেনসেই সঙ্গে নৈতিক চরিত্রের মূলনীতিসমূহকে পরিপূর্ণ বাস্তব জীবনের ভিত্তি হিসাবে কার্যত স্হাপিত করারও দাওয়াত দিয়াছিলেনঠিক এই জন্যই যে কথা বলা ও প্রচার করার কারণে বরং বাতিল ব্যবস্হার সহিত সংশ্লিষ্ট সকল সুযোগ-সুবিধাও পরিত্যাগ করিতে এবং পূর্ণ নিষ্ঠা, একাগ্রতা ও সামঞ্জস্যের সহিত দ্বীন-ইসলাম অনুসরণ করিয়া চলিবার আহবান জানাই; উপরন্তু সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য জান-মাল, সময়-শ্রম সব কিছুই উসর্গ করিয়া চেষ্টা-সাধনা করিবার জন্যও যখন আহবান জানাই, তখন এই মারাত্মক অপরাধ’ (?) যে বাস্তবিকই ক্ষমার যোগ্য নহে, তাহা সকলেই বুঝিতে পারেনআমাদের কথা যদি সত্য বলিয়া মানিয়া লওয়া হয়যদি বলা হয় যে, দ্বীন-ইসলামের ইহাই দাবী, ইহা পূরণের জন্য একনিষ্ঠ ও একমুখ হওয়া কর্তব্য, প্রকৃতপক্ষে বাতিল ব্যবস্হার সহিত ঈমানদার ব্যক্তিকে সমঝোতা নহে, সংঘর্ষের সৃষ্টি করিতে হইবে এবং সেই জন্য দ্বন্দ্ব-সংগ্রাম হওয়া বাঞ্ছনীয়, তাহা হইলে নিম্নলিখিত দুইটি উপায়ের যে কোন একটিকে গ্রহণ করা ভিন্ন আর কিছুই করিবার থাকে নাহয় নিজেদের স্বার্থের কোরবানী বরদাশত করিয়া কার্যত এই আন্দোলনে ঝাপাইয়া পড়িতে হয়, (কিন্তু এই কাজের তীব্রতা ও গুরুত্ব ভয়ানক) অথবা ইহাকে স্বীকার করার পর শুধু মনের দুর্বলতার দোহাই দিয়া এই আন্দোলন হইতে দূরে সরিয়া থাকিতে হয়

কিন্তু এই কথা স্বীকার করাও সহজ কাজ নহেকারণ এই কথা স্বীকার করিলে পরকালে মুক্তি নিশ্চয়তা ও গ্যারান্টি যে নষ্ট হইয়া যায় শুধু ইহাই নহে, ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রেও ইহাদের আবহমানকালের প্রতিষ্ঠিত শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা ক্ষুন্ন হয়এইরূপ ক্ষতি স্বীকার করা ব্স্তবিকই কঠিন ব্যাপারএই জন্য একটি বড় দল এই ব্যাপারে এক তৃতীয় পথ অবলম্বন করিয়াছে তাহারা আমাদের দাওয়াত ও আন্দোলনকে ভুল তো বলিতে পারে না, কারণ তাহা বলার বিন্দুমাত্র অবকাশ কোথাও নাইকিন্তু সুস্পষ্ট ভাষায় ইহার সত্যতা স্বীকার করিলেও মূলনীতিকে বাদ দিয়া বিশেষ কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিষোদগার করিয়াই তাহারা ব্যাপারটিকে যথাসম্ভব ঘোলাটে করিয়া তোলে যেন এই সত্যের আন্দোলন হইতে দূরে থাকার যৌক্তিকতা প্রমাণিত হয়এ সম্পর্কে আমি শুধু ইহাই বলিতে চাই যে, আজ তাহারা যেসব কথা ও যুক্তি পেশ করিয়া মানুষের মুখ বন্ধ করার প্রয়াস পাইতেছে, কিয়ামতের দিন খোদার মুখও যে তাহারা এই যুক্তি দ্বারা বন্ধ করিতে পারিবে না, তাহা আজই তাহাদের ভাবিয়া দেখা উচিত

 

 

 

 

 

আমাদের কর্মনীতি

অতঃপর আমাদের এই আন্দোলনের জন্য গৃহীত কর্মনীতি সংক্ষেপে পেশ করিতে চেষ্টা করিবআমাদের মূল দাওয়াতের ন্যায় আমাদের কর্মনীতিও কুরআন এবং নবীদের কর্মনীতি তইতে গৃহীত হইয়াছেআমাদের দাওয়াত যাহারা গ্রহণ করে, আমরা তাহাদেরকে সর্বপ্রথম কার্যত খোদার দাসত্ব অনুযায়ী জীবন গড়িয়া তুলিতে এবং এই কাজে নিজেদের ঐকান্তিক নিষ্ঠা ও একাগ্রতার প্রমাণ উপস্হিতি করিতে বলিয়া থাকিঈমানের বিপরীত সকল কাজ হইতেই তাহাদের নিজেদের জীবনকে পবিত্র করিতেও বলিবস্তুত এখান হইতেই তাহাদের চরিত্র শুদ্ধি, স্বভাব-প্রকৃতি গঠন এবং উহার যাচাই শুরু হইয়া যায়যাহারা বড় ও উচ্চ লক্ষ্য সম্মুখে রাখিয়া উচ্চশিক্ষা লাভ করিয়াছেন, তাহাদেরকে নিজেদের রচিত গগনচুম্বী স্বপ্ন-প্রাসাদ নিজেদের হাতেই ধূলিসা করিয়া দিতে হয় এবং এমন এক জীবন ক্ষেত্রে পদক্ষেপ করিতে হয়, যাহাতে মান-সম্মান, পদমর্যাদা, অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যের সম্ভাবনা তাহাদের নিজেদের জীবনেই শুধু নহে, পরবর্তী কয়েক পুরুষ পর্যন্ত পরিলক্ষিত হয় নাআর যাহাদের আর্থিক স্বচ্ছলতা, লুণ্ঠিত সম্পদ, অংশীদারীদের অপহৃত অংশ এবং উত্তরাধিকারীদের হক নষ্ট করা সম্পত্তি জমি-জায়গার উপর স্হাপিত, এই আন্দোলনে যোগ দেওয়ার ফলে তাহাদেরকে ইহার সবকিছু ত্যাগ করিয়া সর্বহারা সাজিতে হয়তাহাদের একমাত্র কারণ এই যে, তাহারা যে খোদাকে নিজেদের মালিক ও মনিব হিসিবে স্বীকার করিয়াছে, সেই খোদাই কাহারো সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রহণ করা মোটেই পছন্দ করেন নাযাহাদের জীবিকা নির্বাহের উপায় শরীয়ত বিরোধী কিংবা বাতিল রাষ্ট্র ব্যবস্হার সহিত সংশ্লিষ্ট ছিল, উন্নতির স্বপ্ন দেখা তো দূরের কথা, বর্তমান উপায়ে অর্জিত খাদ্যের একমুঠি গলাধকরণ করাও তাহাদের পক্ষে দুঃসহ হইয়া পড়েফলে তাহা বর্তমান জীবিকার উপায় পরিত্যাগ করিয়া অন্য একটি পবিত্র পন্হা- তাহা যতই নিকৃষ্ট হোক না কেন- গ্রহণ করিতে প্রাণপ্রণে চেষ্টা করেএতদ্ভিন্ন উপরে যেমন বলিয়াছি কার্যত এই আদর্শ গ্রহণ করিলেই প্রত্যেকটি লোকের সর্বাপেক্ষা নিকটবর্তী লোকজন তাহার দুশমন হইয়া পড়েতাহার পিতা-মাতা, ভাই-বন্ধু, স্ত্রী-সন্তান এবং নিকটাত্মীয় লোকই সর্বপ্রথম তাহার ঈমানের সহিত দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয় এই আদেশ গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গে অনেক মানুষেরই শান্তিপূর্ণ ও স্নেহময় নীড় বোলতার বাসায় পরিণত হয়বস্তুত ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের ইহাই হইতেছে সর্বপ্রথম ট্রেনিংকেন্দ্রএই কেন্দ্রের মারফতের আমরা স, নিষ্ঠাবান ও বিশ্বাসযোগ্য চরিত্র এবং দৃঢ় স্বভাব-প্রকৃতির কর্মী লাভ করিয়া থাকিইহা ইসলামী আন্দোলনের অনূকুলে খোদার তরফ হইতে এক স্বাভাবিক অবস্থাএই প্রাথমিক অগ্নিপরীক্ষায় যাহারা ব্যর্থ হয়, তাহারা এই আন্দোলন ও সংগঠন হইতে স্বতঃই ঝরিয়া পড়ে, আমাদের সেই জন্য বিশেষ কোন কষ্ট স্বীকার করিতে হয় নাআর যাহারা ইহাতে সাফল্য লাভ করে, তাহারা নিজেদের প্রাথমিক নিষ্ঠা, একাগ্রতা, ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, দৃড়সংকল্প, সত্যের প্রতি প্রেম এবং সুদৃঢ় স্বভাব-প্রকৃতির অস্তিত্ব প্রমান করে যাহা খোদার পথে অন্তত প্রাথমিক পদক্ষেপ এবং পরীক্ষার প্রথম অধ্যায় অতিক্রম করার জন্য একান্তই অপরিহার্যএই অধ্যায়ের সফলতা প্রাপ্ত লোকদের আমরা আমরা অপেক্ষাকৃত অধিক বিশ্বাসযোগ্য মনে করিয়া দ্বিতীয় অধ্যায়ের দিকে অগ্রসর করিতে পারিকারণ এই অধ্যায়ে পূর্বাপেক্ষাও অধিক কঠিন পরীক্ষা দেখা যায়সেই পরীক্ষা আর একটি অগ্নিকুন্ডের সৃষ্টি করে, তাহাও পূর্বানুরূপজাল মুদ্রাগুলিকেবাছাই করিয়া দূরে নিক্ষেপ করে এবং খাঁটি ও অকৃত্রিম মুদ্রাগুলি আমাদের কাছে রাখিয়া দেয়আমাদের জ্ঞানমতে আমরা দৃঢ়তার সহিত বলিতে পারি যে, মানবীয় খনি হইতে অকৃত্রিম ও কার্যকরী অংশগুলি ছাটাই করিবার এবং উহাদের অধিকতর কর্মপযোগী করিয়া তুলিবার জন্য ইহাই চিরন্তন ও শাশ্বত পন্থাএই অগ্নিকুন্ডে যে তাকওয়াগড়িয়া ওঠে, তাহা ফিকাহ শাস্ত্রের পরিমাপে উত্তীর্ণ না হইলেও এবং পীরের খানকারমানদন্ডে অসম্পূর্ণ হইলেও মূলত এই ধরনের তাকওয়াই বিশ্ব পরিচালনার গুরুদায়িত্ব পালন করিবার এবং এই বিরাট আমানতের দুর্বহ ভার বহন করিবার যোগ্য হইয়া থাকেখানকায়যে তাকওয়ার সৃষ্টি হয়, তাহা ইহার একশত ভাগের একভাগও বহন করিবার যোগ্য হইতে পারে না

দ্বিতীয়ত, জামায়াতের সদস্যদের উপর আদর্শ প্রচারেরও দায়িত্ব অর্পণ করা হয় যে সত্যের আলো তাহারা লাভ করিয়াছে, উহাকে নিজেদের নিকটবর্তী পরিবেশের সকল লোকের মধ্যে বিকীর্ণ করিও তাহাদের অন্যতম ও প্রধান কর্তব্যএইসব ক্ষেত্রে হইতেও যাহাতে কিছু না কিছু লোক এই সত্যকে গ্রহণ করে, সেই জন্য চেষ্টা করা তাহাদের দায়িত্ব হিসাবে গণ্য হয়এখানে আবার নতুন পরীক্ষা শুরু হইয়া যায়সর্বপ্রথম এই প্রচারমূলক কাজের চাপে প্রচারকের নিজের জিবনই নির্ভুল হইতে শুরু করেকারণ এই কাজ আরম্ভ করার সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য দূরবীক্ষণ ও সন্ধানী আলো (SEARCH-LIGHT) তাহার জীবন ও চরিত্রের দিকে উত্তোলিত হয়ফলে প্রচারকের নিজের জীবনে ঈমান বিরোধী সামান্য কিছু থাকিলেও এই বিনা পয়সার সংশোধনী প্রচেষ্টার সাহায্যে তাহার নিজের নিকট উহা স্পষ্ট হইয়া ধরা পড়ে এবং নিরন্তর চাবুক লাগাইয়া তাহার জিবনকে নিখুঁত ও নিমর্ল করিয়া তোলেপ্রচারকই প্রকৃতই যদি এই দাওয়াতের প্রতি ঐকান্তিক নিষ্ঠার সহিত ঈমান আনিয়া থাকে, তবে এই সমালোচনায় সে মোটেই ক্ষিপ্ত ও ক্ষুদ্ধ হইবে না এবং গোঁজামিল দিয়া নিজের কাজের ভুল গোপন করিতে কখনও চেষ্টা করিবে নাবরং লোকদের এই সমালোচনার আলোকে তাহা নিছক পরিশুদ্ধতার উদ্দেশ্যে হইলেও বিনা পরিশ্রম ও বিনা ব্যয়ে নিজেকে পরিশুদ্ধ করিয়া লইবার অবকাশ পাইবেযে পাত্রকে শত শত হাত মাজিয়া-ঘষিয়া সাফ করিতে চেষ্টা করিবে, উহার ময়লা যতই পুঞ্জীভূত হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত তাহা যে নির্মল ও স্বচ্ছ হইবে তাহাতে সন্দেহ নাই

শুধু তাহাই নহে, এই ধরনের প্রচার-প্রক্রিয়ার ফলে আমাদের কর্মীদের মধ্যে এমন অনেক গুণ বৈশিষ্ট্যের উকর্ষ হয়, যাহা পরবর্তী কর্মক্ষেত্রে স্বতন্ত্রভাবে বৃহত্তর কাজে ব্যবহার করা যায়প্রচারক যখন নানাবিধ প্রতিকূল ও হতাশাব্যঞ্জক অবস্হার মধ্য দিয়া অগ্রসর হইতে থাকে, কোথাও তাহার উপর বিদ্রুপবান বর্ষিত হয়, কোথাও অপমানকর উক্তি শুনিতে হয়, অসংখ্য প্রকার ভসনা এবং নানাবিধ মূর্খতামূলক কার্য দ্বারা তাহাকে অভ্যর্থনা করা হয়, কোথাও তাহার উপর নানা প্রকার দোষারোপ ও অভিযোগ উত্থাপন করিয়া তাহার জীবনকে ভারাক্রান্ত করিয়া তোলা হয়, কোথাও তাহাকে নানা প্রকার ফেতনা ও ঝগরা-বিতর্কে জড়াইবার জন্য অভিনব উপায় অবলম্বন করা হয়, কোথাও তাহাকে ঘর হইতে বিতাড়িত করা হয়, উত্তরাধিকার হইতে বঞ্চিত করা হয়, বন্ধুতা এবং আত্মীয়তা ছিন্ন করা হয় এবং তাহার নিজ পরিবেশে তাহার জীবন দুর্বিষহ করিয়া দেওয়া হয়এইরূপ অবস্হায়ও আমাদের যে কর্মী সাহস হারায় না, সত্যের এই আন্দোলন হইতে বিরত থাকে না, বাতিলপন্হীদের সম্মুখে আত্মসমর্পন করিতে প্রস্তুত হয় না, বিক্ষুব্ধ হইয়া নিজের বুদ্ধি-বিবেচনার ভারসাম্য হারায় না, বরং ইহার বিপরীত বৈজ্ঞানিক কর্মপন্হা, গভীর বুদ্ধিমত্তা, নমনীয় দৃঢ়তা, স্হিরতা, সততা, ন্যায়পরায়ণতা, পরহেযগারী ও ঐকান্তিক একনিষ্ঠ মন লইয়া নিজ আদর্শের অনুকূল করিয়া তুলিবার জন্য অবিশ্রান্তভাবে চেষ্টা করে, তাহার মধ্যে যে উচ্চতর মহান গুণাবলীর পূর্ণবিকাশ ও উকর্ষ সাধিত হইবে, তাহাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকিতে পারে নাআর ব্স্তুত এই ধরনের গুণ-বৈশিষ্ট্যই ইসলামী আন্দোলনের পরবর্তী অধ্যায়সমূহে একান্ত অপরিহার্য

আদর্শ প্রচারের জন্য আমরা আমাদের কর্মীদের কুরআনে উপস্হাপিত কর্মনীতিই শিক্ষা দিতে চেষ্টা করিয়াছিঅর্থা যুক্তি, জ্ঞান, বুদ্ধি এবং মহ উপদেশের সাহায্যে লোকদেরকে খোদার পথে আহবান জানানো, ক্রমশ এবং অত্যন্ত স্বভাবিক ক্রমিক নীতি অনুসারে লোকদের সম্মুখে দ্বীন ইসলামের প্রথমিক ও বুনিয়াদী মূলনিতিসমূহের ভিত্তিতে বাস্তব জীবন গড়িয়া তুলিতে চেষ্টা করা কাহাকেও সাধ্যাতীত খোরাক দান, মূলনীতির পূর্বে খুঁটিনাটি বিষয় পেশ করা, মৌলিক দোষ-ত্রুটি দূর করিতে চেষ্টা করার পরিবর্তে বাহ্যিক দোষক্রটি দূর করিতে চেষ্টা করিয়া সময় নষ্ট করার মত অবৈজ্ঞানিক কাজ করিতে কর্মীদেরকে বিশেষভাবে নিষেধ করা হয়অবসাদ এবং বিশ্বাস ও কর্মগত ভ্রান্তিতে জড়িত লোকদের সহিত ঘৃণা ও অবজ্ঞা মিশ্রিত ব্যবহার না করিয়া একজন সুদক্ষ চিকিসকের ন্যায় সহানুভূতি ও কল্যাণ কামনার সহিত মানুষের প্রকৃত রোগের চিকিসা করিতে চেষ্টা করাই আমাদের কাজসনা এবং পাথর নিক্ষেপের উত্তরে কল্যাণকর কাজ করিতে শেখা, অত্যাচার ও নিপীড়ন হইলে ধৈর্য ধারণ করা , অজ্ঞ-মূর্খ লোকদের সহিত কু-তর্কে এবং স্বার্থসংকুল বিসম্বাদে লিপ্ত না হওয়া, অর্থহীন কথাবার্তার উন্নত ও মহান আত্মার ন্যায় উপেক্ষা করাই আমাদের কর্মীদের বৈশিষ্ট্যসত্যের আদর্শ হইতে যাহারা দূরে থাকিতে চেষ্টা করে, তাহাদের পশ্চাদ্ধাবন করার পরিবর্তে সত্যানুসন্ধিসু লোকদের দিকেই অধিকতর দৃষ্টি দেওয়া কর্তব্য-বৈষয়িক পদমর্যাদার দিক দিয়া তাহারা যতই হীন হোকনা কেনএই চেষ্টা সাধনার ব্যাপারে রিয়াকারী ও প্রদর্শনীমূলক কাজকর্ম হইতে দূরে থাকা, নিজেদের কীর্তিকলাপ গণিয়া গৌরবের সহিত লোকদের সম্মুখে পেশ করিয়া তাহাদের দৃষ্টি আকর্ষন করিতে চেষ্টা না করা, সকল কাজ একমাত্র খোদার উদ্দেশ্যে করা এবং উহার ফল খোদার নিকট হইতেই পাইবার আশা করা আমাদের কর্মীদের কর্তব্যতাহাদের মনে এ ভাব থাকা দরকার যে, আল্লাহ তাহাদের সকল কাজ দেখিতেছেন এবং তিনি তাহাদের সকল কাজের মূল নিশ্চয়ই দিবেনদুনিয়ার মানুষ উহার মূল্য বুঝুক আর না বুঝুক, মানুষ কোন সুফল দিক আর শাস্তিই দিক তাহাতে কিছু আসে যায় না বস্তুত এইরূপ কর্মনীতিতে অনন্যসাধারণ ধৈর্য, সহিষ্ণুতা এবং অবিশ্রান্ত চেষ্টা সাধনার প্রয়োজনদীর্ঘকাল পর্যন্ত ক্রমাগত কাজ করার পরও হয়ত কোনরূপ সুফল লাভ হইবে না-কৃত্রিম প্রদর্শনমূলক কর্মনীতিতে যদিও অল্প সময়ের কাজের দ্বারাই বিরাট লোভনীয় ফল লাভ করা যায়, কিন্তু আমাদের কর্মীগণ তাহা আদৌ গ্রহণ করিবে নাইহার ফলে আমাদের কর্মীদের মধ্যে গভীর অন্তর্দৃষ্টি, গাম্ভীর্য, বুদ্ধিমত্তা, কর্মদক্ষতা ও প্রত্যুপন্নমতিত্ব সৃষ্টি হয়এই আন্দোলনের অত্যধিক সংকটপূর্ণ এ শ্রমসাধ্য অধ্যায়সমূহে এই গুণাবলীর সর্বাধিক গুরুত্ব রহিয়াছেইহার ফলে আন্দোলন কিছুটা মন্হর গতিতে অগ্রসর হইতে থাকিলেও উহার প্রতিটি পদক্ষেপ সুদৃঢ় ও গভীর ভিত্তিতে স্হাপিত হয় একমাত্র এই ধরনের কর্মনীতির সাহায্যেই সমাজের সর্বোত্তম অংশকে আন্দোলনে টানিয়া আনা সম্ভবস্হূল দৃষ্টিসম্পন্ন অপদার্থ লোকদের বিরাট ভীড় সৃষ্টি করার পরিবর্তে উল্লিখিত রূপ কর্মনীতির দ্বারাই সমাজের সর্বাধিক সলোকদেরকে আন্দোলনের কর্মী হিসাবে পাওয়া যাইতে পারেএই ধরনের একজন কর্মী সহস্র অকর্মণ্য অপদার্থ লোকের অপেক্ষা যে সমধিক মূল্যবান ও শক্তিপ্রদ তাহাতেও কোন সন্দেহ থাকিতে পারে নাআমাদের কর্মনীতির একটি বিরাট অংশ এই যে, আমরা নিজেদেরকে বাতিল শাসন ব্যবস্হার আইন-আদালতের সাহায্যে সুযোগ হইতে বঞ্চিত করিয়াছিআমরা নিজেদের মানবীয় অধিকার, নিজেদের জান-মাল, সম্মান-সম্ভ্রম কোন জিনিসেরই রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বাতিল রাষ্ট্র ব্যবস্হার কোন সাহায্যই গ্রহণ করিব না- যদিও ইহা আমাদের সকল সদস্যের উপর কর্তব্য হিসাবে চাপাইয়া দেওয়া হয় নাই, বরং ইহাকে একটি উচ্চমান হিসাবে সকলের সম্মুখে পেশ করা হইয়াছে এবং সকলকে ইহা গ্রহণ সম্পর্কে স্বাধীনতা দেওয়া হইয়াছেতাহারা ইচ্ছা করিলে এই উচ্চতর মান পর্যন্ত পৌছিতে পারে, অন্যথায় প্রতিকূল অবস্হায় ঘাত-প্রতিঘাতে পরাজিত হইয়া অধোগতি লাভ করিবেঅবশ্য নিম্ন গতিরও এখানে একটা সীমা নির্দিষ্ট করিয়া দেওয়া হইয়াছেসেই শেষ সীমাও যাহারা লঙ্ঘন করিবে, যাহারা তাহাও নীচে পড়িয়া যাইবে, তাহাদেরকে আর জামায়াতের মধ্যে থাকিবার সুযোগ দেওয়া হইবে নাযে মিথ্যা মোকদ্দমা করে, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়, কিংবা কোন যুক্তিসংগত কারণ ব্যতীত মোকদ্দমায় জড়াইয়া পড়ে- নিছক স্বার্থপরতা, লালসাবৃত্তি চরিতার্থতা কিংবা কোন বন্ধুতা বা আত্মীয়তার অমূলক সম্ভ্রম রক্ষার জন্য কোন মোকদ্দমায় লিপ্ত হয় জামায়াতে ইসলামীতে তাহার কোন স্হান হইতে পারে না

আইন ও আদালত সম্পর্কে অনুসৃত আমাদের এই নীতির যৌক্তিকতা আপাতদৃষ্টিতে অনেকেই অনুধাবন করিতে সমর্থ হয় না, এই জন্য নানা প্রকার অমূলক প্রশ্ন উত্থাপন করেকিন্তু একটু চিন্তা করিলেই ইহার অন্তর্নিহিত বিপুল সার্থকতা উপলব্ধি করা যায়প্রথমত, ইহা দ্বারা আমরা আমাদেরকে একটি আদর্শবাদী জামায়াত হওয়ার কথা বাস্তব কাজের সাহায্যে প্রমাণিত করিতে পারিমনে রাখা দরকের যে ইহা একটি তামাশা ও স্ফূর্তির ব্যাপার নহে; এই জন্য অত্যন্ত তিক্ত ও কঠিন অগ্নিপরীক্ষায় নিজেকে সমর্পণ করিতে হয়আমরা যখন বলি, মানব জীবনের জন্য আইন রচনার অধিকার আল্লাহ ছাড়া আর কাহারো নাইযখন দাবী করি , প্র্রভুত্ব (SOVEREIGNTY) একমাত্র আল্লাহর এবং খোদার আনুগত্য না করিয়া ও তাহার আইন না মানিয়া পৃথিবীতে হুকুম বা শাসন চালাইবার অধিকার কেহ পাইতে পারে নাআমাদের বিশ্বাসই যখন এই যে, খোদায়ী আইন ব্যতীত মানুষের ব্যাপারসমূহের বিচার-ফায়সালা যে করিবে, সে কাফির, ফাসিক এবং জালিম, তখন আমাদের বিশ্বাস ও দাবী অনুযায়ী ও খোদার আইনের ভিত্তিতে আমাদের অধিকার স্হাপিত হওয়া কোন মতেই উচিত নহেবাতিল রাষ্ট্র ক্ষমতার উপর আমরা হক ও বাতিলের বিচার ভার স্বভাবতই ন্যস্ত করিতে ক্ষতি এবং বিপদকালেও যথাযথভাবে পূরণ করিয়া দেখাইতে পারি, তবে ইহা আমাদের সততা, আমাদের স্বভাব, দৃঢ়তা, আদর্শবাদতা এবং আমাদের বিশ্বাস ও বাস্তব কাজে গভীর সামঞ্জস্যের সুস্পষ্ট প্রমাণ হইবেপক্ষান্তরে কোন স্বার্থ, আশা, লোভ, কোন বিপদাশঙ্কা, কোন যুলুম- নিপীড়নের আঘাত যদি আমাদের ঈমানের বিরুদ্ধে কাজ করিতে আমাদের বাধ্য করে, তবে ইহাতে আমাদের আভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও আমাদের স্বভাব- প্রকৃতির অন্তসারশূন্যতা প্রকট হইয়া উঠিবে এবং অতঃপর সেই জন্য প্রমাণেরই আবশ্যক হয় নাদ্বিতীয়ত, আমাদের সদস্যদের বিশ্বস্ততা প্রমাণ করিবার জন্য ইহা আমাদের নিকট এক সন্দেহাতীত মানদন্ড বিশেষআমাদের মধ্যে কোন সব লোক আস্হাভাজন, সুদৃঢ় এবং কোন ধরনের পরীক্ষায় তাহারা উত্তীর্ণ হইতে পারিবে বলিয়া আশা করা যায়, তাহা ইহারই মারফতে সঠিকভাবে জানিতে পারা যায়

ইহার তৃতীয় এবং বিরাট সার্থকতা এই হইবে যে, আমাদের সদস্যগণ এই নীতি গ্রহণ করিবার পর সমাজের সহিত নিজেদের সম্পর্কে ও সম্বন্ধ আইনের পরিবর্তে ন্যায়নীতি ও নৈতিকতার ভত্তিতে স্হাপন করিতে স্বতঃই বাধ্য হইবেতাহাদিগকে নিজেদের নৈতিক চরিত্র এত উচ্চমান পর্যন্ত পৌঁছাইতে হইবে- পরিবেশের মধ্যে নিজেকে এতদূর সত্যাদর্শ, দ্বীনপন্হী, খোদাভীরু এবং মঙ্গলময় কাজের বাস্তব প্রতীক হইতে হইবে যে, সমাজের লোকগণ স্বতঃই তাহাদের অধিকার, মান-সম্মান এবং জানমাল রক্ষা করিতে বাধ্য হইবেকারণ এই নৈতিক সংরক্ষণ ব্যতীত আত্মরক্ষার আর কোন উপায় এই দুনিয়ায় তাহাদের নাইএমতাবস্তায় নৈতিক নিরাপত্তা লাভ করিতে না পারিলে নিবিড় অরণ্যের শৃগাল পালের মধ্যে একটি ছাগল ছানার মতই তাহার অবস্হা হইবে, তাহাতে সন্দেহ নাই

চতুর্থত, আমরা এইভাবে নিজেদেরকে ও নিজেদের সকল স্বার্থ ও অধিকারকে বিপদের মুখে নিক্ষেপ করিয়া বর্তমান সমাজের নৈতিক অবস্হাকে একবারে উলঙ্গ করিয়া তুলিতে চাইআমরা পুলিশ, আদালতের সাহচর্য গ্রহণ করি না জানিতে পারিয়া চারিদিক হইতে আমাদের অধিকারের উপর যখন দস্যুবৃত্তির আঘাত হানা হইবে, তখন আমাদের দেশের ও সমাজের নৈতিক অবস্তা বিশ্বের সম্মুখে প্রকাশিত হইয়া উঠিবে তখন বুঝিতে পারা যাইবে যে, আমাদের মধ্যে কত লোক শুধু আইন, শাসন ও পুলিশের ভয়েই ভদ্রসাজিয়াছে, আর কতলোক ধর্ম, নৈতিকতার ও মানবতার মিথ্যা আবরণে আত্মগোপন করিয়া আছে এবং ধরপাকড়ের ভয় না পাইলে প্রকাশ্যভাবে দস্যুবৃত্তির যথার্থতা দেখাইতে পারেইহা দ্বারা আরও প্রমাণিত হইবে যে, সময় ও সুযোগ পাইলে এইসব ভদ্রধর্মচারী লোক নিকৃষ্টতম চরিত্রহীনতা, ধর্মহীনতা এবং পাশবিকতার বাস্তব প্রমাণ পেশ করিতে পারেবস্তুত ইহা আমাদের জাতীয় নৈতিক চরিত্রের মধ্যে একটি গৃণ্যের ন্যায় ইহাকে ধ্বংসের দিকে লইয়া যাইতেছেআমাদের এই কর্মনীতির ফলে এই ভিতরকার রোগ লোকসমক্ষে প্রকট হইয়া উঠিবেতাহা দেখিয়া আমাদের সমাজের চক্ষু যেন উম্মীলিত হয় এবং যে মারাত্মক রোগকে আজ পর্যন্ত উপেক্ষা করা হইয়াছে উহার ভয়াভহতা সম্পর্কে যেন সঠিক ধারণা জন্মে। (আইন-আদালতের আশ্রয় গ্রহণ না করা নীতি ব্রিটিশ আমলে বর্তমান ছিলপাকিস্তান আমলে এ নীতি পরিত্যক্ত হইয়াছেবাংলাদেশ আমলে এ নীতিই চালু রহিয়াছেব্রিটিশ আমলের এই কঠিন নীতি কেউ মানিয়া চলিতে পারিলে খুবই ভাল অবশ্য এ নীতি চাপাইয়া দেওয়ার বিষয় নয়-পালন করিবার ব্যাপার।)-অনুবাদক

আমাদের এই দাওয়াত ও কর্মনীতি আপনারা গভীর দৃষ্টিতে যাচাই কেরিয়া দেখুন, তীব্র সমালোচনার দৃষ্টিতে ইহা পরীক্ষা করুন, আমরা মানুষকে কোনক দিকে ডাকিতেছি এবং সেই জন্য যে কর্মনীতি আমরা গ্রহণ করিয়াছি তাহা অনুধাবন করুন- তাহা কতখানি সত্যআল্লাহ এবং তাহার রাসূলের বিধানের সহিত ইহার সামঞ্জস্য আছে কি না, বর্তমান সমাজে ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত রোগের ইহা কতখানি প্রতিষেধক হইতে পারে, তাহা গভীরভাবে যাচাই করিয়া দেখুনআল্লাহর দ্বীনকে সর্বজয়ী এবং বাতিল মতবাদকে নির্মূল করার যে মহান উদ্দেশ্যে আমরা এই আন্দোলন চালাইতেছি, তাহা কতখানি কার্যকরি হইতে পারে তাহাও ভাবিয়া দেখুন

অতঃপর কতগুলি সন্দেহ ও সংশয় সম্পর্কে আমি আলোচনা করিব এবং সেই সম্পর্কে আমার জবাব পেশ করিব

 

আলিম ও পীর সাহেবদের দোহাই

একটি পুরাতন প্রশ্ন নতুন করিয়া উত্থাপন করা হইতেছেতাহা এই যে, দেশের বড় বড় আলিম ও পীর সাহেবান কি দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে ওয়াকিফহাল নহেন? উহার যে রূপ আজ জামায়াতে ইসলামী মারফতে ফুটিয়াছে, তাহারা কি আগেই তাহা বুঝিতে পারেন নাই? উপরন্তু যেমন বলা হইয়াছে, তাহাদেরকে বারবার বলা সত্ত্বেও তাহারা উহা গ্রহণ করেন নাশুধু তাহাই নহে, ইহার সহযোগিতা পর্যন্ত করিতে প্রস্তুত নহেন, ইহারই বা কারণ কি? ইহা দ্বারা কি এই কথা প্রমাণিত হয় যে, তাহারা দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে জামায়াতের পক্ষ হইতে যাহা কিছু প্রচার করা হয়, তাহাই মূলত দ্বীন ইসলামের বহির্ভূত জিনিস?

এই প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর এই যে, দ্বীন ইসলামকে বর্তমান কি অতীতের ব্যক্তিদের নিকট হইতে বুঝিতে চেষ্টা না করিয়া সব সময়ই কুরআন ও নবী করীম (সা.) -এর সুন্নাহ হইতে বুঝিতে চেষ্টা করিয়াছিএই জন্য খোদার দ্বীন আমার নিকট এবং অন্যান্য ঈমানদার ব্যক্তিদের নিকট কি দাবী করে, তাহা জানিবার জন্য কোন বুযুর্গ ব্যক্তি কি করেন আর কি বলেন, সেই দিকে আদৌ ভ্রুক্ষেপ করি নাইইহার পরিবর্তে আমি সবসময়ই কুরআন এবং রাসূলের কর্মনীতি বুঝিতে চেষ্টা করিয়াছিঅতএব জ্ঞান লাভের এই পন্হার দিকে আমি আপনাদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করিবআমি যেদিকে আপনাদেরকে আহবান জানাইতেছি এবং এজন্য গৃহীত কর্মনীতি কুরআন পাকের নির্দেশসমূহ ও নবীদের কার্যকলাপ হইতে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয় কি না, আপনারা অনাবিল ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে শুধু তাহার বিচার করুনকুরআন ও সুন্নাহ হইতে ইহা প্রমাণিত হইলে- আপনারা কুরআন ও সুন্নাহ হইতে জ্ঞান লাভ করিতে যদি প্রস্তুত থাকেন, তবে আপনারা আমার দাওয়াত গ্রহণ করুন, আমার সঙ্গে আপনারাও মিলিত হউন আমাদের দাওয়াত ও কর্মনীতিতে কুরআন ও সুন্নাহর বিপরীত কিছু থাকিলে অসংকোচে তাহা প্রমাণ করুনআমরা কোথাও কুরআন সুন্নাহ হইতে একবিন্দু দূরে সরিয়া গিয়াছি এই কথা যদি বাস্তিকই প্রমাণিত হয়, তবে প্রকৃত সত্য গ্রহণে আমরা এক মুহূর্তও বিলম্ব করিব না কিন্তু হক ও বাতিল প্রমাণ করার জন্য আপনারা যদি কুরআন ও সুন্নাহ ব্যতীত ব্যক্তি বিশেষের উপর নির্ভর করেন তবে তাহা আপনাদের ইচ্ছাধীনআপনারা আজ নিজেদের ভবিষ্যত ব্যক্তিদেরই হাতে সমর্পন করুন, খোদার নিকটও তাহাই বলিবেন যে, আপনার দ্বীনকে কুরআন ও সুন্নাহর পরিবর্তে ব্যক্তিদের উপর ছাড়িয়া দিয়াছিলেন- এইরূপ উত্তর যদি আপনাদের খোদার নিকট রক্ষা করিতে পারে বলিয়া মনে করেন, তবে পৃথিবীর মানুষ আমাদের কথায় দৃষ্টিপাত করিলে তাহাদেরই কল্যাণ হইবে, না করিলে তাহাদেরই ক্ষতি হইবে- তাহাতে আমাদের কোন ক্ষতি-বৃদ্ধি হইবে না

তারপর দরবেশ ও দুনিয়াত্যাগী একটি দল গঠন করার কথা বলিয়া যে বিদ্রুপ করা হইয়াছে, তাহার উত্তরে আমাদের কথা এই যে, এই সম্পর্কে কোন প্রকার ভুল ধারণা বা ভুল ব্যাখ্যাদানের অবকাশ থাকা উচিত নহেবস্তুত আমরা এমন একটি দল গঠন করিতে চাই , যাহার প্রত্যেকটি লোক একদিকে তাকওয়া -পরহেযগারীর ক্ষত্রে সমাজের সাধারণ পরহেযগার মুত্তাকীদের তুলনায় শ্রেষ্ঠতর হইবে, আর অপরদিকে বিশ্ব পরিচালনার যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতার দিক দিয়াও সাধারণ দুনিয়াদার লোকের অপেক্ষা অনেক অগ্রসর হইবেআমাদের মতে বিশ্বের সকল ভাঙ্গন ও বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ এই যে, সততা ও নেকী সম্পর্কে সঠিক ধারনা না থাকার দরুন ঘরের কোণায় গিয়া বসা এবং বাস্তব জগতের কাজ - কর্মের সহিত সকল সম্পর্ক ছিন্ন করাকেই পরহেযগারী মনে করা হয়ইহার ফলে সমগ্র বিশ্বের পরিচালন-ভার সর্বাপেক্ষা অস লোকদের হাতে আসিয়া পড়েএই অস লোকদের মুখে নেকীর নাম উচ্চারিত হইলেও তাহা শুধু জনগণকে তাহাদের কোন সম্পর্ক থাকে না এই বিপর্যয়ের সংশোধন হইতে পারে একটিমাত্র উপায়ে এবং তাহা এই যে খোদার নেক বান্দাহদের একটি সুসংবদ্ধ জামায়াত গঠন করিতে হইবে, এই দলের প্রত্যেকটি লোক খোদাভীরু হইবে, ন্যায়পন্হী ও বিশ্বাসভাজন হইবে, খোদার মোনোনীত চরিত্র ও গুণাবলীতে ভূষিত হইবে এবং সেই সঙ্গে বিশ্ব পরিচালনার যোগ্যতাও সর্বাধীক হইবে, যেন বর্তমান দুনিয়ার লোকদের এই দুনিয়াদারীর ব্যাপারেই তাহারা পরাজিত করিতে পারেআমাদের দৃষ্টিতে এতদপেক্ষা বড় রাজনীতি আর কিছুই হইতে পারে নাউপরন্তু ন্যায়পন্হীদের সুসংবদ্ধ করিয়া তুলিবার চাইতে বেশী কালোপযোগী ও সফল রাজনৈতিক আন্দোলন আর কিছুই হইতে পারে নাবস্তুত এমন একটি দল যতদিন গড়িয়া না উঠিতেছে, ততদিন পর্যন্ত বর্তমান নৈতিক চরিত্রহীন ও আদর্শহীন নেতৃবৃন্দ দুনিয়ার চারণভূমিতে চরিয়া বেড়াইবার অবসর পাইবেকিন্তু যখন এই দল গঠিত হইবে তখন আপনারা বিশ্বাস করুন-কেবল এই দেশেরই নহে, সমগ্র পৃথিবীর রাজনীতি, অর্থনীতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য, বিচার-ইনসাফ সব কিছুরই কর্তৃত্ব এই নতুন আদর্শবাদী দলেরই হস্তে অর্পিত হইবেতখন এখানে ফাসিক ও কাফিরদের প্রদীপ আদৌ জ্বলিতে পারিবে নাএই বিপ্লব কিভাবে সম্পন্ন হইবে, তাহা আমি বলিতে পারি নাকিন্তু ইহা যে অনুষ্ঠিত হইবে তাহাতে আমার আগামীকালের সূর্যদয়ের ন্যায় সন্দেহাতীত বিশ্বাস রহিয়াছেকিন্তু সেই জন্য শর্ত এই যে, লোকদের একটি দল সুসংবদ্ধ করিয়া গড়িয়া তুলিতে হইবে

 

জামায়াতের কর্মীদের প্রতি উপদেশ

সাধারণ আলোচনা এখানেই শেষ করিয়া অতঃপর আমি জামায়াতের কর্মীদের নিকট কয়েকটি বিশেষ দরকারী কথা বলিতে চাই

সর্বপ্রথম আমি আপনাদের যে কথাটি বলিতে চাই, তাহা যদিও প্রত্যেক সম্মেলনেই বলিয়া থাকি, তবুও আমি আজও তাহাই আপনাদেরকে বলিবআপনারা বুঝিয়া শুনিয়া সচেতনভাবে খোদার নিকট প্রতিশ্রুতি দিয়া যে বিরাট দায়িত্ব নিজেদের স্কন্ধে চাপাইয়া লইয়াছেন, তাহার গুরুত্ব আপনারা গভীরভাবে অনুভব করুনআপনারা খোদার আইন নিজেরা সর্বাধিক পালন করিয়া চলিলেই আপনাদের বিশ্বাস, কথা ও কাজ সামঞ্জস্যপূর্ণ হইলেই এবং আপনাদের জীবনের প্রত্যেকটি দিক ও বিভাগ ইসলামের আদর্শ অনুযায়ী গঠন করিয়া হইলেই এই বিষয়ে আপনার কর্তব্য আদৌ পূর্ণরূপে পালিত হইতে পারে নাবরং আপনি যে ইসলামের প্রতি ঈমান আনিয়াছেন, যে আদর্শকে আপনি আপনার প্রভুর দ্বীন বলিয়া বশ্বাস করিয়াছেন, যে পথকে আপনি গোটা মানব জাতির জন্য চিরন্তন সত্য ও একমাত্র পথ বলিয়া মনে করেন, সেই ইসলামকে পৃথিবীর অন্যান্য সমগ্র দ্বীন, ও জীবন ব্যবস্হার বিপর্যয় ও ধ্বংসমূলক রীতি-নীতি হইতে মানবতাকে মুক্তি দিয়া সত্য দ্বীন এবং অপরিসীম কল্যাণের বন্যা প্লাবনে সিক্ত ও প্লাবিত করিবার জন্য চেষ্টা সাধনা করার অপরিহার্য কর্তব্য হইতেছে আপনার প্রতি সেই দ্বীন ইসলামীর অন্যতম প্রধান দাবী বর্তমান দুনিয়ার বাতিল সমাজ ব্যবস্হার অনুগামীগণ নিজ নিজ মিথ্যা ও বিপর্যয়কারী মতের সমর্থনে যতখানি নিষ্ঠা ও আত্মোসর্গী ভাব দেখাইয়া থাকে তদপেক্ষা অনেক বেশী আপনাদের দেখাইতে হইবে ইসলামের জন্যআপনাদের চোখের সম্মুখেই অসংখ্য লোক কঠিনতম বিপদ, ধন-সম্পত্তি বিরাট অপচয়, জান-প্রাণের অপূরণীয় ক্ষতি, দেশের পর দেশের ধ্বংস এবং নিজের সন্তানদের ও নিজ আত্মীয়-স্বজনদের কুরবানী অবলীলাক্রমে সহ্য করিতেছে- শুধু এইজন্য যে, তাহারা যে জীবন-পদ্ধতিকে নির্ভুল মনে করে, যে ব্যবস্হায় নিজেদের কল্যাণ নিহিত বলিয়া বিশ্বাস করে, তাহারা উহাকে কেবল নিজেদের দেশেই নহে, সমগ্র পৃথিবীতেই জয়ী করিয়া তুলিতে চায়তাহাদের ধৈর্য, আত্মদান, শ্রম-সাধনা, দুঃখ-মুসীবত, সহিষ্ণুতা এবং তাহাদের জীবনোদ্দেশ্যের জন্য প্রেম-ভালবাসার সহিত আপনারা তাহাদেরকে অতিক্রম করিয়া যাইবেনকিন্তু বর্তমানে আপনাদের অর্থদান, সময় ও শ্রম ব্যয় করা, নিজেদের উদ্দেশ্যের প্রতি প্রেম এবং সেই জন্য কুরবানীর যে হার রহিয়াছে, তাহার পরিপ্রেক্ষিতে আপনাদের হস্তে এই ঝান্ডা উম্মীলিত হইবার আশাটুকু পোষণ করারও কোন অধিকার আপনাদের নাই দ্বিতীয়ত, আমি বরাবর আপনাদেরকে যে কথা বলিবার প্রয়োজনীয়তা বোধ করি, তাহা এই যে, আপনারা দ্বীন ইসলামের নীতিগত ও বুনিয়াদী ব্যাপারে গুরুত্ব অনুধাবন করিবেনখুঁটিনাটি ব্যাপারের দিকে আজ পর্যন্ত বেশী দুরুত্ব আরোপ করা হইয়াছেসমগ্র ধার্মিক সমাজ যদি রোগে আক্রান্ত হইয়া জরাজীর্ণ হইয়াছে, তাহা আপনারা পরিত্যাগ করুনআমি অনুভব করিতেছি যে, আমার এবং জামায়াতের আরো কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির প্রাণপন চেষ্টা সত্ত্বেও খুঁটিনাটি ব্যাপারের উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করার রোগ আমাদের জামায়াতে এখনো বর্তমান রহিয়াছে এই রোগ মাঝে মাঝে এত তীব্র হইয়া দেখা দেয় যে, আমাদের উপদেশ অনুযায়ী উহা পরিত্যাগ করিবার পরিবর্তে স্বয়ং আমাদেরকেই খুঁটিনাটি ব্যাপারে জড়াইবার ব্যর্থ চেষ্টা করা হয়ব্যাপারটি গভীরভাবে অনুধাবন করা বাঞ্ছনীয়যে সব খুঁটিনাটি ব্যাপার লইয়া আপনারা বিতর্ক করেন, তাহা যতই গুরুত্বপূর্ণ হউক না কেন, মূলত ইহার একটি জিনিসকেও কায়েম করিবার জন্য আল্লাহ তাআলা নবী প্রেরণ করেন নাইনবীদের আগমন এবং খোদার কিতাব নাযিল হওয়ার উদ্দেশ্য ছিল খোদার সত্য দ্বীনকে কায়েম করাতাহাদের সকল চেষ্টা সাধনার মূল লক্ষ্য ছিল বিশ্ব-মানবকে এক খোদার অনুগত ও অধীন করিয়া অন্যান্য সকল প্রকার গোলামী হইতে মানবতাকে নিষ্কৃতি দান করাতাহারা সকলেই যেন একমাত্র আল্লাহরই আইন মানিয়া চলিতে বাধ্য হয়ভয় যেন কেবল খোদাকেই করে, কেবল খোদার হুকুম যেন মানিয়া চলেহক ও বাতিলের পার্থক্য, জীবনে সত্য পথের নির্দেশ কেবল তাহাই গ্রহণযোগ্য, আল্লাহ দিয়াছেনখোদার নীতি-বিরোধী সকল অন্যায় ও পাপ ব্যবস্হাকে নির্মূল করা এবং খোদার মনোনীত সকল কল্যাণ ব্যবস্হার প্রতিষ্ঠা করাও তাওহিদের অপরিহার্য কর্তব্যএই দ্বীন ইসলাম কায়েম করাই আমাদের উদ্দেশ্যমুসলিম হিসাবে আমাদেরকে এই কাজের আদেশই দেওয়া হইয়াছেএই কাজের গুরুত্ব গভীরভাবে অনুধাবন করিতে চেষ্টা করুনএই কাজ বন্ধ হইয়া গেলে দুনিয়াতে বাতিল জীবন ব্যবস্হা জয়ী হইবে এবং তাহার ফলেই বিশ্ববাসীর উপর খোদায়ী গযব আসিতে পারে, নিশ্চিতরুপে বুঝিয়া লউনসেই সঙ্গে এই কথাও জানিয়া লউন যে, সেই গযব হইতে আত্মরক্ষা করা এবং খোদার সন্তোষ লাভের একমাত্র উপায় হইতেছে খোদার দ্বীন ইসলাম কায়েম করিবার জন্য শক্তি, ধন, সময়, জান-প্রাণ, মস্তিষ্ক, ভাষা- সককিছুই উসর্গ করাবস্তুত আপনারা যদি এই কথা হৃদয়-মনে অনুভব করিতে পারেন, তবে আপনারা কখনই এইসব বৃথা তর্কে জড়িত হইবেন নাআমার মনে হয়, দ্বীন ইসলামের নিগূঢ় তত্ত্ব এবং উহার দাবী সঠিকভাবে উপলব্ধি করিতে না পারাই এইসব বিতর্ক ও কু-তর্কে জড়াইয়া পড়িবার মূল কারণ

আমাদের কর্মীদের মধ্যে আর একটি ত্রুটি পরিলক্ষিত হইতেছে আদর্শ, উদ্দেশ্য ও মতবাদের দিক দিয়া তাহারা জামায়াতকে হয়তো ভালো করিযা বুঝিতে পারিয়াছে, কিন্তু কর্মনীতি আদৌ বুঝিতে পারে নাইএই জন্য বারবার তাহাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হইতেছে এবং টানা-হেঁচড়া করিয়া আমাদের উদ্দেশ্য ও অন্যান্য দলের কর্মনীতি মিলাইয়া একটা অভিনব জগাখিচুড়ি সৃষ্টি করিতে বিশেষভাবে চেষ্টা করেতাহাদেরকে এই কাজ করিতে নিষেধ করিলে তাহারা মনে করে, একটি গতিবান কর্মনীতিকে অনর্থক উপেক্ষা করা হইতেছেমনে করে হয়তো বা শুধু হিংসার বশবর্তী হইয়াই ইহা করা হইতেছেঅনেকের প্রগলভতা এতদূর দেখা গিয়াছে যে, তাহাদের এই ধরনের কর্মতপরতা সম্পর্কে সতর্ক করিয়া দিলে তাহারা অমনি বলিয়া বসে, “নাম জামায়াতেরই লওয়া হইবে, অপরের নহে’’ ইহারা হয়তো ধারণা করিয়াছে যে, জামায়াতের একটি রেজিস্ট্রী করা ট্রেড মার্ক চালু করাই এই চেষ্টা ও সাধনার উদ্দেশ্যআরো আশ্চর্যের বিষয় এই যে, ইহা বুঝিয়াও তাহারা আমাদের সঙ্গে এখনো পর্যন্ত জড়িত হইয়া আছেআমাদের কোন কোন শাখা জামায়াত এই রোগে মারাত্মক আক্রান্ত হইয়াছেআরো অনেক লোকের মধ্যে একটি তীব্র গতিশীল কর্মনীতি গ্রহণ করিয়া অবিলম্বে বিরাট কিছু করিয়া দেখাইবার আকাঙ্খা ও চিন্তা দেখা দেয়বস্তুত ইহা চিন্তাহীন কর্মের প্রাচীন রোগ ছাড়া আর কিছুই নহেইহা যুগ যুগ ধরিয়া মুসলমানদের মধ্যে সংক্রামিত হইয়া রহিয়াছে কাজেই ইহাও কর্মহীন চিন্তা অপেক্ষা কম মারাত্মক নহেআমি নিশ্চিত করিয়া বলিতে চাই, বর্তমান ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দলসমূহে বস্তুত যদি প্রাণবন্তুবলিতে কিছু থাকিত, তবে আমরা নতুন একটি দল গঠনের ব্যাপারে হয়তো ইতস্তত করিতামকিন্তু আল্লাহ যাহা কিছু বুদ্ধি-জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টি আমাকে দান করিয়াছেন, তাহার উপর নির্ভর করিয়া আমি সুস্পষ্ট ভাষায় বলিতে পারি যে, বর্তমানে প্রচলিত অন্যান্য আন্দোলন ও নেতৃত্বের কোন একটির মধ্যেও মুসলমানদের মারাত্মক রোগের চিকিসা করার প্রকৃত ক্ষমতা নাইইসলামের প্রতিষ্ঠা ও দাবী পূরণ তো দূরের কথা, মুসলমানদের সমস্যা ও রোগ সম্পর্কে এই সব দলের পক্ষ হইতে যাহা কিছু বলা হইতেছে, তাহা অত্যন্ত স্হূলইসলামের প্রকৃত দাবী সম্পর্কে ইহাদের কোন ধারণা নাইকাফিরী ও ফাসিকীর এই দিগ্বিজয় এবং দ্বীন ইসলামের এই শক্তিহীনতার প্রকৃত কারণও সঠিকভাবে ধরিতে পারে নাইউপরন্তু এই অবস্হার পরিবর্তনের জন্য কোন ক্রমিক গতিতে কোন কোন ক্ষেত্রে কি কাজ করিতে হইবে, তাহা গভীরভাবে অনুধাবন করিয়া স্হূলদৃষ্টিতে যেসব আন্দোলন পরিচালিত হইতেছে এবং সেই জন্য যে তীব্র গতিশীল কর্মনীতি প্রয়োগ করা হইয়াছে আমরা তাহাকে ভুল না বলিলেও, উহার দোষ-ত্রুটির সমালোচনা না করিলেও এবং উহার অন্তর্নিহিতর প্রতি শ্রদ্ধা জানাইলেও উহার ব্যর্থতা সম্পর্কে আদৌ কোন সন্দেহ নাইএই ধরনের আন্দোলন পূর্ণ সফলতা ও আলোড়নের সহিত কয়েক শতাব্দী কাল পর্যন্ত একাধারে চলিতে থাকিলেও মানুষের জীবন-ব্যবস্হার ক্ষেত্রে যে সামান্যতম বিপ্লবও সৃষ্টি হইতে পারে না, তাহা আমি নিঃসন্দেহে বলিতে পারিপ্রকৃত বিপ্লব যদি সৃষ্টি হয়ই, তবে তাহা ইসলামের এই আন্দোলনের ফলেই হইবে এবং সেই জন্য আমাদের গৃহীত কর্মনীতিই একমাত্র স্বাভাবিক ও কার্যকরি হইতে পারেকারণ দ্বীন ইসলামের প্রকৃত এবং উহার ইতিহাসের গভীরতর অধ্যয়ন যাচাই করার পরেই ইহা গৃহীত হইয়াছেতবে আমাদের কর্মনীতি যে অত্যন্ত ধৈর্য সাপেক্ষ, মন্হর এবং অচিরেই তাহাতে কোন অনুভবযোগ্য ফল লাভের আশা করা যায় না-বরং তাহাতে দীর্ঘকাল পর্যন্ত অবিশ্রান্তভাবে সাধনা করিয়া যাইতে হয়তাহাতে একটুও সন্দেহ নাই কিন্তু ইহাতেও সন্দেহ নাই যে, এই কাজে সাফল্য লাভের একমাত্র পন্হা ইহাই, এতদ্ব্যতীত অন্য কোন পথেই এই উদ্দেশ্য লাভ হইতে পারে নাআমাদের ইদ্দেশ্য ও কর্মনীতি কোন একটিও যাহাদের পছন্দ নহে, তাহারা জামায়াতের এই দুইটির মধ্যে কোন একটিরও নিজেদের ইচ্ছামত সংশোধন কি পরিবর্তন-পরিবর্ধন করিতে চেষ্টা করিলে তাহা মোটেই বরদাশত করা যাইবে নাআমাদের সহিত চলিতে চাহিলে আমাদের আদর্শ ও কর্মনীতিকে মনে ঐকান্তিক সমর্থনের সহিত অনুসরণ করিতে হইবে আর অন্যান্য আন্দোলনের প্রতি যাহাদের মনের যোগ রহিয়াছে, তাহারা সেই পথ ও মতের যাচাই করিয়া দেখিতে কারেন

স্হূলদর্শিতা, প্রদর্শনীমূলক মনোবৃত্তি এবং দ্রুততার যে মারাত্মক দুর্বলতা মুসলমানদের মধ্যে বর্তমানে সাধারনত দেখা যায়, সম্প্রতি তাহার একটি প্রমাণ পাওয়া গিয়াছেকয়েকমাস পূর্বে আমি বয়স্কদের শিক্ষাদান সম্পর্কে একটি পদ্ধতি পেশ করিয়াছিলামকিন্তু তাহা কাহারও মনকে আকৃষ্ট ও অনুপ্রাণিত করিতে পারে নাইকিন্তু দল বাধিয়া গ্রামে গ্রামে গলিতে গলিতে ঘুরিয়া বেড়ান এবং অবিলম্বে বিরাট ফলদানের উপযোগী কোন কর্মনীতি গ্রহণের জন্য বিভিন্ন স্হান হইতে অনেকেই দাবী জানাইতেছেঅথচ এই ধরনের কর্মনীতি স্হূলদৃষ্টিতে যত বড় ফলই দিক না কেন, তাহা যে ক্ষণস্হায়ী, তাহাতে এতটুকু সন্দেহ নাইকিন্তু তাহাদের বারবার বুঝাইয়া দেওয়া সত্ত্বেও তাহারা এই আশ্চর্য ধরনের প্রচেষ্টা হইতে বিরত হইতেছে নাএক প্রকারের কর্মনিহিত হইতেছে, কিছু সংখ্যক অশিক্ষিত লোককে একত্রিত করিয়া এক বসর কি ততোধিকাল পর্যন্ত শিক্ষা দেওয়া এবং ইসলামের আদর্শ অনুযায়ী তাহাদেরকে তৈরি করা তাহাদের আকীদা- বিশ্বাস, নৈতিক চরিত্র, দৈনন্দিন কাজকর্ম, জীবনোদ্দেশ্য, ভাল-মন্দের মাপকাঠি-প্রত্যেকটি দিক দিয়াই তাহাদেরকে ইসলামের বিধান অনুসারে পরিবর্তিত করা এবং তাহাদেরকে জামায়াতের কর্মী হিসাবে নিযুক্ত করাএই ধরনের বয়স্কদের শিক্ষা পদ্বতির মারফতে তৈরি কর্মীদেরকে মজুর, কৃষক এবং গণফ্রন্টের ইসলামী আন্দোলনের কর্মী হিসাবে অনায়সেই নিযুক্ত করা যাইতে পারে

আর এক প্রকারের কর্মনীতি হইতেছে- অত্যল্প সময়ের মধ্য সহস্র লোক জমা করিয়া ইসলামের কয়েকটি প্রাথমিক বিষয়ের প্রচার করা এবং অবিলম্বে তাহাদের মধ্যে এক প্রকারের কর্মতপরতার সৃষ্টি করাকিন্তু এইরূপ আকস্মিক উচ্ছ্বাস-সৃষ্ট কর্মতপরতা কিছুতেই স্হায়ী লাভ করিতে পারে নাএই দুইটি কর্মপন্হার মধ্যে- আমি দেখিতেছি প্রথমটির দিকে লোকদের উসাহ খুবই কমআর শেষোক্তটির দিকে লোক দলে দলে ঝুঁকিয়া পড়িতেছেপ্রথম প্রকারের কর্মনীতি মূলত স্হায়ী ফলপ্রদ, কিন্তু সময় সাপেক্ষ, সাধনা এবং ধৈর্য-নির্ভরএই অবস্হার কথা চিন্তা করিলে মুসলমানদের দুইটি দুর্বলতা সুস্পষ্ট হইয়া উঠে, বস্তুত এই দুর্বলতাই তাহাদেরকে আবহমানকাল হইতে সাময়িক উচ্ছ্বাসমূলক কাজে নিজের শক্তি, শ্রম, সময়-সম্পত্তি অপচয় করিতে বাধ্য করিয়াছেএই সম্পর্কে আমি শুধু এতটুকুই বলিতে পারি যে, জামায়াতে ইসলামীর পরিচালনা-ভার যতদিন আমার উপর ন্যস্ত থাকিবে, আমি আমার সহকর্মীদেরকে নির্ভুল, প্রকৃত ও সঠিক ফলপ্রদ কাজেই নিযুক্ত করিতে চেষ্টা করিব, সচেতনভাবে তাহাদেরকে কখনও নিষ্ফল প্রচেষ্টায় নিযুক্ত করিব না

বক্তব্য শেষ করিবার পূর্বে একটি সর্বশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ কথা আপনাদেরকে বলিতে চাইআমাদের জামায়াতের মধ্যে কিছু সংখ্যক লোক এমন আছেন যাহারা তাবলীগ ও প্রচারণামূলক কাজে অত্যন্ত কঠোর ও নির্মম অচরণ অবলম্বন করিয়া থকেনআমার নিকট যেসব প্রশ্ন পেশ করা হইতেছে, তাহা হইতে সহজেই অনুমান করা যায় যে, পথভ্রষ্ট লোকদের ইসলামের দিকে টানিয়া আনার এবং তাহাদের সঠিক পথে পরিচালিত করার চিন্তা যতখানি না আছে, তদপেক্ষা অধিক চিন্তা হইয়াছে নিজেদের ভিতরের লোকদের বিচ্ছিন্ন করা সম্পর্কেধার্মিকতার উচ্ছ্বাস তাহাদের মধ্যে সহানুভূতির কল্যাণ কামনার ভাবধারা যত না জাগাইয়াছে, তাহা অপেক্ষা অনেক বেশী জাগাইয়াছে ঘৃণা, উপেক্ষা এবং ক্রোধএই জন্যই তাহারা আমাকে জিজ্ঞাসা করে যে, যাহাদের মধ্যে অমুক দুর্বলতা রহিয়াছে, তাহারা জামায়াতের সহিত সম্পর্ক ছিন্ন করে না কেন? তাহাদের সহিত মিলিয়া নামায পড়িব কেন? কিংবা তাহাদেরকে কাফির, মুশরিক বলা হইবে না কেন? কিন্তু এই প্রশ্নকারীরা পথভ্রষ্ট লোকদেরকে সত্যের পথে টানিয়া আনিবার উপায় ও পন্হা কি হইতে পারে, সেই সম্পর্কে কিছুই জিজ্ঞাসা করার দরকার বোধ করে নাইইহাদের অবসাদ, অবজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা মর্মান্তিক, তাহাদেরকে ইসলামের আলোকে আলোকমন্ডিত করিতে চেষ্টা করা আমাদের কর্তব্যআমার মনে হয়, যাহারা খোদার অনুগ্রহে সত্য পথের সন্ধান পাইয়াছে, তাহাদের মনে এই সত্যপ্রাপ্তি কৃতজ্ঞতার পরিবর্তে অহঙ্কার সৃষ্টি করিয়াছেআমার ধারণা ভুল হইলেই মঙ্গলকিন্তু প্রসঙ্গত আমি সুস্পষ্ট ভাষায় বলিতে চাই যে, জামায়াতের প্রত্যেক ব্যক্তিরই সূক্ষ্মভাবে নিজের মন যাচাই করা কর্তব্যএই ব্যাপারে প্রত্যেকেরই মনে খোদার ভয় সক্রিয় থাকা উচিত এবং শয়তানের প্রতারণা হইতে নিজেকে প্রতি মুহূর্তে সতর্ক রাখা কর্তব্যমহামারী-আক্রান্ত কোন লোকালয়ে কয়েকজন স্বাস্হ্যবান ব্যক্তির অবস্হা যাহা হয়, বর্তমান বিপর্যস্ত সমাজে কিছু সংখ্যক লোকের সঠিক জ্ঞান ও সকাজ করার সৌভাগ্য লাভও ঠিক তদ্রূপউক্ত লোকালয়ে মুষ্টিমেয় স্বাস্হ্যবান ব্যক্তি কোন চিকিসার ব্যাপারে যদি কিছুমাত্র দক্ষতা রাখেন এবং তাহাদের কিছু ঔষধ বর্তমান থাকে, তবে তাহাদের প্রকৃত কর্তব্য কি? তাহারা তাহাদের মহামারী রোগীর প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন করিবে? কিংবা তাহাদেরকে দূর বিতাড়িত করিবে বা তাহাদেরকে তদবস্হায় রাখিয়া তাহারা নিজেরা পলায়ন করিবার চেষ্টা করিবে? অথবা তাহারা নিজেদেরকে বিপদের মুখে নিক্ষেপ করিয়া রোগাক্রান্ত লোকদের চিকিসা ও সেবা-শুশ্রূষা করার জন্য যত্নবান হইবে? এই প্রচেষ্টায় কিছু ময়লা তাহাদের শরীর স্পর্শ করিলেও তাহাদের আকুষ্ঠচিত্তে তাহা সহ্য করা কর্তব্যআমি দৃঢ়তার সহিত বলিতে পারি যে, প্রথম প্রকার পন্হা গ্রহণ করিলে তাহারা খোদার নিকট অপরাধী সাব্যস্ত হইবে এবং তাহাদের স্বাস্হ্য, চিকিসা সম্পর্কে তাহাদের অভিজ্ঞতা এবং তাহাদের নিকট প্রয়োজনীয় ঔষধ বর্তমান থাকায় তাহাদেরকে আরো অধিক অপরাধী প্রমাণ করিবেএই উদাহরণকে গভীরভাবে বুঝিয়া লইয়া এই কথাও চিন্তা করুন যে, যাহারা দ্বীন ইসলামের দৃষ্টিতে স্বাস্হ্য সম্পন্ন,যাহাদের নিকট দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে নির্ভুল জ্ঞান বর্তমান এবং সমাজকে সত্যের আদর্শে সংশোধনের কার্যকরী পন্হাও যাহাদের নিকট বর্তমান, তাহাদের জন্য খোদার সন্তোষ লাভের জন্য পন্হা কোন সঠিক ও হইতে পারে

 

 

কোন মন্তব্য নেই

Deejpilot থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.