Header Ads

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ। আমার ব্যক্তিগত ব্লগ সাইটে আপনাদর স্বাগতম

চরিত্র গঠনের মৌলিক উপাদান

 

চরিত্র গঠনের মৌলিক উপাদান

 

 নঈম সিদ্দিকী   




মানুষের পরতা যত বৃদ্ধি পায়, যত অধিক গুরুত্ব অর্জন করে, সেখানে শয়তানের হস্তক্ষেপও ততই ব্যাপকতর হতে থাকেএদিক দিয়ে বর্তমান যুগ উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্টের অধিকারীএ যুগে একদিকে পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী ও স্বার্থপূজারী সভ্যতা আমাদের জাতির নৈতিক পতনকে চরম পর্যায়ে উপনীত করেছে, অন্যদিকে চলছে সমাজতন্ত্রের নাস্তিক্যবাদী চিন্তার হামলাএ হামলা আমাদের জাতির মৌলিক ঈমান-আকীদার মধ্যে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করেছেএর ফলে ইসলামের সাথে জাতির গভীর প্রেম-প্রীতিময় সম্পর্কের ভিত্তি নড়ে উঠেছেবিপর্যয় ও অনিষ্টকারিতারসিপাহসালারশয়তান যে চ্যালেঞ্জ দিয়েছিল হুবহু তারই চিত্র যেন আজ ফুটে উঠেছেশয়তান বলেছিলঃ আমি (হামলা করার জন্য) এদের (মানব জাতির ) সামনে থেকে আসবো, পিছন থেকে আসবো, ডান দিক থেকে আসবো, বাম দিক থেকে আসবো।(সুরা আরাফ-১৭)

এ অবস্থায় আমাদের অনেক কল্যাণকামী বন্ধূ দুনিয়ার ঝামেলা থেকে সরে এসে সংসারের একান্তে বসে কেবল নিজের মুসলমানিত্বটুকু বজায় রাখার জন্য প্রচেষ্টা চালাবার উপদেশ দান করে থাকেনঅবশ্য এ অবস্থার মধ্যে অবস্থান করা মামুলী ব্যাপার নয়সাধারণ অবস্থায় প্রত্যেক স ব্যক্তি নৈতিকতার আদর্শকে কায়েম রাখেকিন্তু নৈতিক উচ্ছৃঙ্খলার প্রবল বাত্যা পরিবেষ্টিত হয়ে উন্নত নৈতিক বৃত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা চাট্টিখানি কথা নয়কিন্তু কিছু সংখ্যক লোক যদি মহামারি আক্রান্ত এলাকা থেকে দুরে অবস্থান করে নিজেদের স্বাস্থ্যোন্নতির কাজে ব্যাপৃত থাকে এবং নিশ্চিন্তে মহামারিকে নৈতিক মৃত্যুর বিভীষিকা চালিয়ে যাবার ব্যাপক অনুমতি দান করে, তাহলে আমাদের মতে এর চাইতে বড় স্বার্থপরতা আর হতে পারে নামাজারের নিকট যে সমস্ত মূল্যবান প্রদীপ ও স্বর্ণনির্মিত বাতিদান অযথা আলোক বিচ্ছূরন করে; অথচ তাদের সন্নিকটে বনে-জঙ্গলে মানুষের কাফেলা পথভ্রষ্ট হয়ে দস্যুহস্তে লূন্ঠিত হয়, সেই প্রদীপ ও বাতিদানের অস্তিত্ব-অনস্তিত্ব যেমন সমান মূল্যহীন, ঠিক তেমনি যে ঈমান, ইসলাম ও তাকওয়া চতুষ্পার্শের পরিবেশকে আলোকিত করার জন্য কর্মক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ার পরিবর্তে বিরোধী শক্তির ভয়ে মসজিদে আশ্রয় খুজে ফেরে, তাও হৃদয়-মনের জন্য নিছক স্বর্ণালংকার বৈ আর কিছুই নয়চরিত্রের যে মূলধনকে ক্ষতির আশংকায় হামেশা সিন্দুকের মধ্যে তালাবদ্ধ করে রাখা হয় এবং যা হামেশা অনুপাদক (productive) অবস্থায় বিরাজিত থাকে, সমাজ জীবনের জন্যে তার থাকা না থাকা সমানমুসলমান নারী-পুরুষ এবং মুসলিম দলের নিকট চরিত্র ও ঈমানের কিছু মূলধনথাকলে তাকে বাজারে আবর্তন (Circulation)করার জন্য ছেড়ে দেওয়া উচিততারপর মূলধন নিয়োগকারীদের মধ্যে যোগ্যতা থাকলে সে মূলধন লাভসহ ফিরে আসবে, আর অযোগ্য হলে লাভ তো দূরের কথা আসল পুঁজিও মারা পড়বেকিন্তু বাজারে আবর্তিত হতে থাকার মধ্যেই পুঁজির স্বার্থকতাঅন্যথায় যত অধিক পরিমাণ পুঁজিই জমা করা হোক না কেন তা পুরোপুরি ব্যর্থ হতে বাধ্য

ইসলামী আন্দোলনের কর্মীগণ যখন তাদের চরিত্র ও ঈমানের ন্যূনতম পুঁজি এ পথে নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন, তখন একে কেবল ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাবার জন্যই নয়; বরং দেশ ও জাতির এবং আমাদের নিজেদেরকেও এ থেকে অধিকতর মুনাফা অর্জনের জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবেএকজন স্বল্প পুঁজিদার ব্যবসায়ীর ন্যায় আমাদের রক্ত পানি করা উপার্জনকে ব্যবসায়ে খাটাবার ব্যাপারে পূর্ণ সর্তকতা অবলম্বন করা উচিতএর পরিচালনা এবং দেখা-শুনার জন্য যাবতীয় উপায়ও অবলম্বন করা কর্তব্যমহামারী আক্রান্ত এলাকায় জনগণের সেবা করার জন্য আমাদের নিজেদের স্বার্থরক্ষার সম্ভাব্য সকল ব্যবস্থা করা প্রয়োজন

আল্লাহর সাথে যথাযথ সম্পর্ক

আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপনই হচ্ছে এ কঠিন পরীক্ষাক্ষেত্রে আমাদের প্রথম ও প্রধান প্রয়োজনএ সম্পর্ক তার প্রত্যাশিত সর্বনিম্নমানের নীচে নেমে আসলে আমাদের সমস্ত প্রচেষ্টা ও তরতা দুনিয়াদারীর রঙে রঙিন হয়ে উঠবে এবং শয়তানের জন্য আমাদের হৃদয়-মনের সমস্ত দুয়ার খুলে যেতে পারেঅতঃপর গোনাহের সৈন্যদের বিবেকের দুর্গাভ্যন্তরে প্রবেশের পথে আর কোন বাঁধা থাকে নাআল্লাহর সাথে সম্পর্ককে প্রতিষ্ঠিত রাখার এবং তাকে ভবিষ্যত বিভিন্ন পর্যায়ের প্রয়োজন অনুযায়ী তরক্কী দেবার জন্য কমপক্ষে নিম্নলিখিত বিষয় সমূহের প্রতি অধিক দৃষ্টিদান অপরিহার্যঃ

আল্লাহর অসীম অনুগ্রহে আমাদের আন্দোলনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত কোন কর্মী মৌলিক ইবাদতসমূহ পরিত্যাগ করেনিকিন্তু কেবল ইবাদত অনুষ্ঠানই যথেষ্ঠ নয়, বরং এ ব্যাপারে পূর্ণ নিয়মানুবর্তিতা এবং এই সঙ্গে আল্লাহর ভয়ে ভীত হবার ও তার সম্মুখে নত ও বিনম্র হবার গুণাবলীও সৃষ্টি হওয়া উচিত ব্যাপারে আমরা এখন কাঙ্খিত মানের সবচাইতে নীচে অবস্থান করছিএটা এমন একটি দুর্বলতা যে, এর উপস্থিতিতে যদি আমরা বড় বড় সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়ি!! বলাবাহুল্য যে জীবন সংগ্রাম থেকে আমরা আলাদা থাকতে পারিনা!!তাহলে আমাদেরকে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে

আল্লাহ তায়ালা নামাজ, রোজা, হজ্ব ও যাকাত অনুষ্ঠানের জন্য যে সকল বিধি-বিধান দান করেছেন এবং এগুলোর মাধ্যমে যে সকল অবস্থা সৃষ্টির প্রত্যাশা করেন; কুরআন ও হাদীসের সাহায্যে আমাদের সহযোগীদের সেগুলো অবগত হওয়া, অতঃপর সে সব যথাযথ ভাবে সম্পাদনের ব্যবস্থা করা উচিতবিশেষ করে নামাজ আদায়ের ব্যাপারে সময়ের প্রতি কঠোর দৃষ্টি রাখা প্রয়োজনজামায়াতের সাথে নামাজ আদায়ের লোভ যদি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি না হয় তাহলে নামাজে আল্লাহভীতি, নতি ও বিনম্র ভাব সৃষ্টি হওয়া কঠিনএ কথাও মনে রাখা দরকার যে, ইবাদতের সাথে সাথে আত্মবিচারে অভ্যস্ত না হলে ইবাদতের মধ্যে প্রাণ সঞ্চার সম্ভব নয়আত্মবিচারের অনুপস্থিতিতে ইবাদতের বাইরের কাঠামো যতই পূর্ণাঙ্গ হোক না কেন তা অন্তঃসারশুণ্যই থেকে যায়

আল্লাহর সাথে সম্পর্কের বিকাশ ও পরিপুষ্টি সাধনের জন্য কুরআন ও হাদীস সরাসরি অধ্যায়ন করা উচিতকুরআন ও হাদীসে আল্লাহ ও তার রাসুল বর্ণিত শিক্ষার উপর যে দলের সমগ্র প্রচেষ্টা-তপরতা নির্ভরশীল, সে দলের কর্মীগণ যদি প্রত্যহ ঈমান ও জ্ঞানের ঐ ঊসদ্বয়ে অবগাহন করার চেষ্টা না করেন, তাহলে যে কোন মুহুর্তে তাদের বিপথে পরিচালিত হবার সম্ভাবনা আছেআধুনিক যুগের জনপ্রিয় জাহিলিয়াতসমুহের যে সকল অন্ধকার গলিপথ আমাদের অতিক্রম করতে হবে এবং সাহিত্য-শিল্প জ্ঞানের অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বিপদসংকুল বনপথে যে সকল দস্যু দলের ব্যুহভেদ করে আমাদের অগ্রসর হতে হবে তার পরিপ্রেক্ষিতে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, দ্বীনি শিক্ষা ও জ্ঞানের প্রদীপ হাতে না নিয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে এক ফার্লং পথও অতিক্রম করা সম্ভবপর নয়

যে আদর্শ ও মতবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা প্রচেষ্টারত তার তাপর্য ও দাবীসমূহ সরাসরি তার আসল উস থেকে জানবার জন্য আমাদেরকে কিছু সময় অন্তত এক-আধ ঘন্টা বা পনের-বিশ মিনিট ব্যয় করা উচিতখুব বেশী সম্ভব না হলেও প্রত্যহ মাত্র একটি আয়াত ও একটি হাদীস পাঠ করি, তার অর্থ পুরোপুরি অনুধাবন করে বাস্তব জীবনে তাকে কার্যকরী করতে প্রয়াস পাই; তাহলে ইনশায়াল্লাহ হকের এ ঔষধগুলো পরিমানের স্বল্পতা সত্ত্বেও তাদের ধারাবাহিকতার কারণে আমাদেরকে আদর্শবিরোধী পরিবেশের বিষবাষ্প থেকে রক্ষা করবে

যে সকল বই-পত্র কুরআন-হাদীস বুঝার ব্যাপারে সাহায্য করে, বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলনের বই-পত্রগুলো নিয়মিতভাবে অধ্যয়ন করা উচিতঅনেক কর্মী কিছু কিছু বই-পত্র অধ্যয়ন করে একেবারে নিশ্চিত হয়ে গেছেন এবং আর বেশী অধ্যয়ন করার তাগিদ অনুভব করছেন নাতারা মনে করেছেন যে, তারা আন্দোলন ও সংগঠনকে পুরোপুরি বুঝে নিয়েছেনঅথচ এটা তাদের নেহায়েত ভুল ধারণা বৈ আর কিছু নয় কিছু কর্মী এমনও আছেন যারা কয়েক বছর আগে একবার যে বইগুলো পড়ে নিয়েছেন, সেগুলো পূণর্বার পড়ে নতুনভাবে প্রেরণা সৃষ্টি করার প্রয়োজনবোধ করেন না অথচ সমস্ত বই-পত্র পড়া এবং বার বার পড়া অত্যন্ত জরুরী

আল্লাহর সাথে সম্পর্ককে সুদৃঢ় করার উদ্দেশ্যে নফল ইবাদতের উপর যথাসম্ভব গুরুত্বারোপ করা প্রতি যুগের ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের জন্য অপরিহার্য বিবেচিত হয়ে এসেছেনফল ইবাদত নিয়মিতভাবে করা এবং এ ব্যাপারে বিশেষ করে গোপনীয়তা রক্ষা করা প্রয়োজননফল ইবাদতের মধ্যে নফল নামাজ, বিশেষ করে তাহাজ্জুদ নামাজের স্থান অতি উচ্চেতাহাজ্জুদ নামাজ ইসলামী আন্দোলনের সৈন্যদের জন্য কঠিন পর্যায় অতিক্রমে সর্বোত্তম সহায়কে পরিণত হয়

নফল ইবাদতের মধ্যে দ্বিতীয় হচ্ছে নফল রোজারআল্লাহর সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করার জন্য এটি উত্তম উপায়মাসে তিনদিন রোজা রাখা সুন্নত, বরং এক যুগ রোজা রাখার সমানএছাড়াও হাদীসে বিশেষ বিশেষ দিবসে রোজা রাখাকে পছন্দনীয় বলে উল্লেখ করা হয়েছেমোটামুটিভাবে এ ব্যাপারে নরম নীতি অবলম্বিত হয়েছে প্রতি দশ দিনে বা প্রতিমাসে একদিন নফল রোজা রাখা যেতে পারে

নফল ইবাদতের মধ্যে আল্লাহর পথে ব্যয় করার প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজের উপার্জন তথা অর্থের একটি অংশ দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োগ করার জন্য পৃথক করে রাখতে অভ্যস্ত হতে হবেএছাড়া আমাদের আন্দোলনের মূলে পানি সিঞ্চন করার দ্বিতীয় কোন পথ নেইবরং এ কথা বলা অত্যুক্তি হবে না যে, বর্তমান কাজের এমন সব পর্যায় দেখা দিচ্ছে যেখানে হয়ত নিজের সৌন্দর্যোপকরণসমূহ বিক্রি করে আল্লাহর দ্বীনের জন্য রসদ যোগাতে হবেআমরা জানি আমাদের বন্ধুদের অধিকাংশই গরীব, মুষ্টিমেয় কয়েকজন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর এবং পার্থিব স্বার্থ থেকে দূরে অবস্থানকারীএ আন্দোলনের পিছনে ধণিক শ্রেনীর কোন সমর্থন নেই অবস্থায় আমাদের সদস্য ও সমর্থকগণ যে পর্যায়ের আর্থিক কুরবানী করে বায়তুলমালকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, কোন পার্থিব স্বার্থভোগী দল তার নজির পেশ করতে পারবে নাকিন্তু আল্লাহ জানেন, নবীর (স) সাহাবাগণ আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় করার যে নজির উপস্থাপন করেছেন আমাদের এ আর্থিক কুরবানী তার তুলনায় এখনও অনেক নিম্নমানেরচিন্তা করুন! বর্তমানে আমরা যে নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছি, সেখানে যদি বায়তুলমালে প্রয়োজনীয় পরিমান খাদ্য সরবরাহ না হওয়ার কারণে আন্দোলনের শিরা-উপশিরায় রক্ত সঞ্চালিত হতে না পারে এবং নিছক এতটুকুন কারণে আন্দোলন ব্যর্থ হয়ে যায়, তাহলে আল্লাহর নিকট আমরা কি জবাব দেব ? তাই আমাদের আল্লাহর পথে অর্থব্যয় করার প্রেরণাকে আরো শক্তিশালী করতে হবে

আল্লাহর সাথে সম্পর্কের জন্য সার্বক্ষণিক যিকির ও দোয়া হচ্ছে একটি মৌলিক প্রয়োজনআল্লাহর নবী (স) সংসার ত্যাগের ধারণা মিশ্রিত যিকিরের পরিবর্তে তার উম্মতকে দিবা-রাত্রের প্রত্যেকটি কাজের জন্য অসংখ্য দোয়া ও যিকির শিখিয়েছেনএগুলো যেন শয়নে, জাগরণে, চলাফেরায়, ওঠা-বসায় তথা প্রত্যেকটি কাজে জারী থাকে

ঘুম থেকে ওঠার জন্য, ঘর থেকে বের হবার জন্য, ঘরের মধ্যে প্রবেশ করার জন্য, কোন আনন্দ মুহুর্তে কোন দুঃখ-কষ্টের সময়, কোন ত্রুটি সাধিত হলে, কোন কাজ শুরু করার জন্য, আজান শুনে, ওজু করার সময়, হাঁচি দিলে, কোন মুসলমানের সাথে সাক্ষাত হলে, পানি পান করার সময়-অর্থা ছোট-বড় প্রত্যেকটি কাজে রাসূলুল্লাহ (স) আল্লাহর যিকির ও তার নিকট দোয়ার জন্য বহু ছোট ছোট সুন্দর কথা শিখিয়েছেনসজ্ঞানে ও সচেতন মনে এ কথাগুলি উচ্চারণ করার সময় মুসলমান নিজেকে তার প্রভূ ও মালিক আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত রাখেআল্লাহকে ভুলে দুনিয়ার কর্মব্যস্ততার মধ্যে সে কখনও নিজেকে হারিয়ে ফেলে নাযিকির ও দোয়ায় তার জীবন ভরপুর হয়ে ওঠে

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সে কখনও সুবহানাল্লাহ (আল্লাহ সকল প্রকার দোষ-ত্রুটি, ক্ষতি, স্বল্পতামুক্ত পাক পবিত্র), কখনও আলহামদুলিল্লাহ (সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য), কখনও আস্তাগফিরুল্লাহ (আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাচ্ছি), কখনও লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন শক্তি সহায় নেই), কখনও সাদাকাল্লাহু ওয়া রাসূলুহু (আল্লাহ ও তার রাসুল সত্য বলেছেন), কখনও রাব্বিগফির ওয়ারহাম (হে আল্লাহ ! আমাকে মা কর এবং আমার প্রতি রহম কর), কখনও আন্তা অলীয়্যী ফিদ্ দুনিয়া ওয়াল আখিরাহ হে আল্লাহ! দুনিয়া ও আখিরতে তুমিই আমার একমাত্র বন্ধু), কখনও হাসবিয়াল্লাহু রাব্বি (আমার মালিক আমার জন্য যথেষ্ট), কখনও নিমাল মাওলা ওয়া নিমাল ওয়াকিল (আল্লাহ আমার সর্বোত্তম বন্ধু ও শ্রেষ্ঠ সহায়) বলতে থাকে এবং তা আন্তরিক প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বলতে থাকে।* এভাবে নিজের সর্বশক্তিমান মালিক ও প্রভুর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে সে প্রতি পদে পদে সেই মহান সর্বশক্তিধর, সত্ত্বার নিকট সকর্ম করার জন্য শক্তি সময় সুযোগ কামনা করেতার নিকট থেকে পথের সন্ধান লাভ করে, কল্যাণ কামনা করে, শয়তানের পরতার মুকাবিলায় তার নিকট আশ্রয় চায়, নিজের ভূল-ত্রুটি সম্পর্কে অবহিত হয়ে তার নিকট ক্ষমাপ্রার্থী হয়এমনিভাবে তার সমগ্র জীবন যিকির, কল্যাণ ও ন্যায়নিষ্ঠতায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে

যিকির ও দোয়াগুলোর আরবীরূপঃ- (১) سـُبحَـا نَ الله (২) الحمد لله (৩) اسـتـغـفـر الله (৪) لا حـولا ولا قـوة الا بـالله (৫) صدق الله و رسـولـه (৬) رب اغـفـر وارحـم (৭) انـت ولـي فـى الـدنـيـا والا خـرة (৮) حـسـبـى الله ربـى (৯) نـعـم الـمـولـى ونـعـم الـوكـيـل-

আমাদের প্রত্যেক কর্মীর জন্য এ ধরণের সচেতন মনে সার্বক্ষণিক যিকিরে অভ্যস্ত হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজনউপরন্তু প্রতি মুহুর্তে নিজের ঈমান, চরিত্র, সবর, তাওয়াক্কুল, সংযম ও নিয়মানুবর্তিতার দৃঢ়তা ও শক্তি বৃদ্ধির জন্য দোয়া করা উচিতএ শক্তি যে কোন সংগ্রামে অত্যন্ত প্রভাবশালী প্রমাণিত হতে পারে

বলাবাহুল্য, যে যিকির ও দোয়া সচেতন মনের অভিব্যক্তি নয়, যার সাথে মানসিক অবস্থার যোগ নেই, যা আল্লাহর উপস্থিতির অনুভূতিহীন, যা প্রদর্শনেচ্ছার কলুষযুক্ত এবং নিছক স্নায়ুবিক ব্যায়ামের পর্যায়ভূক্ত, তা থেকে আকাঙ্খিত ফল লাভ সম্ভব নয়কাজেই যিকির-দোয়া, চিন্তা ও চেতনার সাথে হওয়া উচিত এবং সাথে সাথে প্রদর্শনেচ্ছা থেকেও মুক্ত হওয়া উচিত

সংগঠনের সাথে সম্পর্ক

কোন দলের সাংগঠনিক ব্যবস্থা যদি ঢিলে থাকে এবং এ অবস্থায় সে কোন বিরাট অভিযানে অংশগ্রহণ করে তাহলে তার অবস্থা হয় ঠিক এমন একটি মোটর গাড়ীর ন্যায়, যার কলকব্জাগুলো ভালভাবে আঁটা হয়নি, অথচ ড্রাইভার এ গাড়ী নিয়ে পার্বত্য পথ অতিক্রম করার জন্য বের হয় এবং পদে পদে অসুবিধার সম্মুখীন হয় এমনকি গাড়ীর মেশিন একেবারে অচল হয়ে পড়ে

সংগঠন প্রত্যেক দলের একটি স্বাভাবিক প্রয়োজনকিন্তু আমাদের নিকট তা কেবল একটি স্বাভাবিক প্রয়োজনই নয় বরং আমাদের দ্বীনদারী, নৈতিকতা, আল্লাহর ইবাদত ও রাসুলের আনুগত্যেরই মূর্তপ্রকাশসাংগঠনিক দুর্বলতা কাজের পথে নানান অসুবিধার র্সষ্টি করেতাই বিভিন্ন দল এই দুর্বলতা দূর করার জন্য চেস্টা করেকিন্তু আমরা মনে করি য়ে, এটা আমাদের পরকালীন ক্ষতির কারণ হবেএ উদ্দেশ্যে আমরা একে হামেশা পরিত্যাজ্য মনে করিতাই সংগঠন শৃংঙ্খলাকে মজবুত করা এবং প্রত্যেক সহযোগীকে এর প্রহরায় নিযুক্ত হওয়া নিজের দায়িত্ব মনে করা অপরিহার্যসংগঠন সম্পর্কে এখানে কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অবতারণা করছি

আদেশ ও আনুগত্যের ভারসাম্য সংগঠনের মেরুদণ্ড ভারসাম্য ছাড়া আদতে সংগঠনের অস্তিত্ব অর্থহীনএ জন্যই এ আদেশ আনুগত্যের ভারসাম্য নষ্ট করা গুনাহ করার শামিলঅর্থা এটা হচ্ছে আল্লাহ ও রাসুলের (স) নাফরমানীএ অপরাধ অনুষ্ঠানের পর মানুষ দুনিয়া ও আখেরাতে সাফল্য লাভ করতে পারে নাকুরআনের দাবী হচ্ছেঃ
اَطـِعُـوا اَللهَ وَاَطـِعـُوا الـرَسـُولَ وَ اُولِـى الاَمـرِ مَنكَـم-
অর্থা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসুলের আনুগত্য কর এবং আনুগত্য কর তোমাদের মধ্য থেকে কর্তৃত্বশীলদের”-সুরা নিসা, আয়াতঃ৫৮

মনে রাখবেন এ তিনটি আনুগত্য হচ্ছে ওয়াজিবএর মধ্য থেকে কোন একটির আনুগত্য পরিহার করলে মুসলমান ক্ষতির সম্মুখীন হয়রাসুলুল্লাহ (স) নিজেই বলেছেনঃযে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করে, সে আল্লাহর আনুগত্য করে এবং যে আমার নাফরমানী করে, সে আল্লাহর নাফরমানী করেআর যে আমার (অর্থা রাসূলের নিযুক্ত অথবা তাঁর আনুগত্যকারী) আমীরের আনুগত্য করে, সে আমার আনুগত্য করে এবং যে আমার আমীরের নাফরমানী করে, সে আমার নাফরমানী করে

হযরত আবু হুরায়রার (রাঃ) একটি বাণী এ কথাটিকে আরো সুস্পষ্ট করে তিনি বলেছেন ঃ এ কথা সন্দেহাতীত সত্য যে, নেতৃবৃন্দের আনুগত্য আল্লাহর আনুগত্য এবং তাদের নাফরমানী আল্লাহর নাফরমানীর নামান্তর

এই প্রসঙ্গে হাদীসের পুস্তকসমূহে চুড়ান্ত নির্দেশসম্বলিত অসংখ্য হাদীস বর্ণিত হয়েছেএই হাদীসগুলোর বক্তব্য হচ্ছে এই যে, ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনা বা দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের জন্য ইসলামী আইন ও সংবিধানের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত সংগঠনের যে সকল লোককে ইসলামী নেতৃত্বের বিশিষ্ট গুণাবলীর পরিপ্রেক্ষিতে উন্নত মানের ইল্ম ও তাকওয়ার অধিকারী হবার কারণে নেতৃত্বের পদে নির্বাচন করা হয়, কর্মসমূহে তাদের আনুগত্য করা শরিয়তের অত্যাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ও ওয়াজিবসমূহের অর্ন্তভূক্ত

এজন্য রাসুলুল্লাহ (স) দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে ঘোষনা করেছেন যে, নাককাটা হাবশীকেও যদি নেতৃত্বের পদে সমাসীন করা হয়, তাহলে তার চেহারা-সুরত, তার বংশ গোত্রগত মর্যাদা, তার আচার-ব্যবহার, রীতি-নীতি, তার রুচি, অনুভূতি ও আবেগ যতই পৃথক ও বিশিষ্ট হোক না কেন এবং এজন্য তা কোন ব্যক্তির নিকট চরম অপ্রিয় হলেও তার পূর্ণ আনুগত্য অপরিহার্যরাসুলুল্লাহ (স) একথাও বলেছেন যে, আমীরের এই আনুগত্যের এই দাবীকে যারা অস্বীকার করবে, তারা বিপুল তাকওয়ার অধিকারী হলেও আখেরাতে তাদের সাফল্যের কোন সম্ভবনা নেইতিনি বলেছেনঃ
যে ব্যক্তি আমীরের আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে সে কেয়ামতের দিন আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষা করবে, যখন (নিজেকে ন্যায়সঙ্গত প্রমাণ করার জন্য) তার নিকট কোন দলিল প্রমাণ থাকবে না

এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে এ কথা আন্দাজ করা যেতে পারে যে, ইসলামী দল ও সংগঠনের পরিচালক ও নেতৃবৃন্দ সাধারণ দুনিয়াপরস্ত রাজনৈতিক দলসমূহের সভাপতি, সহ-সভাপতি ও তাদের উপদেষ্টাগণের সমপর্যায়ভূক্ত ননবরং এখানে পরিচালকবৃন্দ ও কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের সদস্যগন একটি বিশেষ দ্বীনি শরিয়তভিত্তিক মর্যাদার অধিকারী হনতাদেঁর অধিকার ও কর্তব্যসমূহও সাময়িক সুযোগ-সুবিধার ভিত্তিতে নয় বরং দ্বীন ও শরিয়তের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় কারনে তাঁদের আনুগত্যের ব্যাপারটি ঠিক সাধারন রাজনৈতিক দলসমূহের নেতৃবৃন্দের আনুগত্যের সমপর্যায়ভুক্ত নয়

যতক্ষণ নেতৃবৃন্দ কুরআন ও সুন্নাহর পথ থেকে প্রকাশ্যভাবে সরে না দাড়ান ততক্ষণ তাঁদের নির্দেশ লংঘন করা অথবা সানন্দে ও সাগ্রহে তাঁদের আনুগত্য করার পরিবর্তে অসন্তুষ্ট চিত্তে আনুগত্য করা, অথবা তাঁদের কল্যাণ কামনা করার পরিবর্তে তাঁদের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ করা, তাঁদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা, তাঁদের গীবত করা, তাদের বিরুদ্ধে অসন্তোষ সৃষ্টি করা, তাঁদেরকে যথার্থ অবস্থা ও ঘটনাবলী সম্পর্কে অবগত না করা, সঠিক পথে চলার জন্য নির্ভুল পরামর্শ দানের ব্যাপারে কার্পণ্য করা এবং তাঁদের গোপন কথাসমূহ প্রকাশ করে বেড়ানো কবীরা গুনাহর অর্ন্তভূক্ত হবেএগুলো এমন পর্যায়ের কবীরা গুনাহ যে, এগুলোর কারণে ইবাদত-বন্দেগী অনুষ্ঠান ও সাধারণ চরিত্র সংশোধন সত্ত্বেও মানুষের আখেরাত বিনষ্ট হতে পারেএই ভয়াবহ অবস্থা মানুষকে মুনাফেকীর পর্যায়ে নামিয়ে দিতে পারেতাই ইসলামী দল ও সংগঠনের মধ্যে অবস্থানকারীদের আনুগত্যের ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে

ইসলাম অবশ্য কখনো অন্ধ আনুগত্যের দাবী করেনি বরং সে কেবল কর্মের ক্ষেত্রে আনুগত্য চেয়েছেকর্মেওসীমার বাইরে তার নির্দেশ হচ্ছেঃ وَلاَ تَعـاَوَنـُوا عَـلَـىَ الاِثـمِ وَالـعُـدوَانِ-
গুনাহ ও আল্লাহর নির্ধারিত সীমালঙ্ঘনমূলক কাজে পরস্পরের সহযোগী হয়ো না”-সুরা মায়েদা, আয়াতঃ ২

ইসলামী দল ও সংগঠনের আভ্যন্তরীন তাগিদেই তার সদস্যবৃন্দকে দলীয় কার্যাবলীর প্রতি কঠোর দৃষ্টি রাখতে হবেএবং দলের পরিচালকগণকে সকর্মের সীমার বাইরে কদম রাখা থেকে বিরত রাখতে হবেএ সম্পর্কে হযরত ওমর (রাঃ) বলেছেনঃবন্ধুগণ! তোমাদের কেউ যদি আমার নীতি বা কাজে বক্র দেখে তাহলে আমার এই বক্রতাকে সোজা করে দেওয়া তার কর্তব্য হয়ে দাড়াবে

এই প্রসঙ্গে কোন খুঁটিনাটি বিরোধ দেখা দিলে, তা দূর করার জন্য তাকে পেশ করার, সে সম্পর্কে আলোচনা করার এবং সন্তোষজনক প্রত্যুত্তর না পেলে তার উপর অবিচল থাকার শরিয়ত ভিত্তিক অধিকারও দলের সদস্য বর্গের আছেকিন্তু পরিচালক বৃন্দের থেকে যে সিদ্ধান্ত কার্যকরী হয়, একমাত্র তারই আনুগত্য করতে হবে আমার মতের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো কেন? এবং আমি যে দৃষ্টিতে অবস্থা পর্যবেক্ষণ করি সে দৃষ্টিতে অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়নি, নিছক এতটুকু কারণে আনুগত্য অস্বীকার করা যেতে পারে নাআনুগত্যের শৃঙ্খলা একমাত্র তখনই ছিন্ন করা যেতে পারে যখন রাসুলুল্লাহর (স) ভাষায় ইসলামের পথ ছেড়ে পরিস্কাভাবে অন্যপথ অবলম্বিত হয়

দায়িত্বশীল ব্যক্তিদেরকে হক পথে রাখার জন্য তাঁদের সমালোচনা করাও কর্মীদের একটি মৌলিক অধিকারকিন্তু অন্যান্য দলে সন্দেহ ও সংশয়ের ভিত্তিতে সমালোচনা করার নীতি স্বীকৃত হলেও ইসলামী দলের জন্য এ নীতি অনৈসলামিক বলে বিবেচিত হবেইসলামী দলে সমালোচনা হয় সু-ধারণার ভিত্তিতেএখানে আপত্তি ও অভিযোগের পরিবর্তে কল্যাণ কামিতা ও সপরামর্শের সূর ধ্বণিত হয়ইসলামী জামায়াতের সাথে সমালোচনায় কেবল এমন পদ্ধতিই খাপ খেতে পারে যেখানে সমালোচকের মনে কোন প্রকার তিক্তভাব থাকে না এবং শ্রোতার মনেও সমালোনা বিরক্তি উপাদন করে না, যেখানে সমালোচনার সাথে কোন প্রতিশোধ স্পৃহা শামিল থাকে না এবং যেখানে নিজের কথাকে স্বীকার করিয়ে নেবার জিদের প্রভাব থাকে না এবং সমালোচনা গ্রহণ না করার ফলে সমালোচক দুঃখিত বা বিরক্ত হয় নাউপরন্ত ইসলামী দলে সমালোচনা হয় মুখোমুখি, সামনা সামনি; পিছনে গিয়ে সমালোচনা নয়, গীবত হয়গীবত ইসলামী দলের প্রতি পয়লা নম্বরের অনিষ্টকারিতার পরিচায়কঅথচ সমালোচনা তার সর্বোত্তম কল্যাণ কামনার পরিচয় বহন করেএ দুয়ের মধ্যে আসমান-জমীন তফা

আমাদের সংগঠনের প্রকৃতিই হচ্ছে এই যে, এখানে দায়িত্বশীলদের যত অধিক দ্ব্যর্থহীন সমালোচনা হয় ততই তা আন্দোলনের জন্য কল্যাণকর হয়কিন্তু পরিচালকদের সম্পর্কে বিদ্রুপাত্মক শব্দ উচ্চারণ করা, তাঁদের মর্যাদার পরিপন্থী বাক্য ব্যবহার করে মনের ঝাল ঝাড়া, তাঁদের ব্যাপার নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করা অথবা তঁদের দুর্বলতা উল্লেখ করে আনন্দ উপভোগ করা অবশ্যই ইসলামী চরিত্রনীতির পরিপন্থী

সমালোচনা অধিকারের ওপর কোন আইনের বাঁধন না থাকার কারণে তাকে একটি স্থায়ী কর্মে পরিনত করা, পরিচালকবৃন্দের প্রতিটি নির্দেশ, কর্ম ও সিদ্ধান্তের এবং তাঁদের প্রতিটি কথার সমালোচনা শুরু করে দেওয়া এবং তাঁদের নির্দেশের পক্ষে পূর্ণাঙ্গ যুক্তি প্রমাণ পেশ করার দাবী করাও বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাড়ায় অবস্থা সৃষ্টি হবার পর এক ব্যক্তি কোন দায়িত্ব গ্রহণ করে একদিনও চলতে পারে নাঅতঃপর দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা দলের সাধারণ সদস্যদের সম্মুখে বসে কেবল জবাবদিহিই করতে থাকবে এবং তাদের আস্হা পূণর্বহাল করার জন্য নিজেদের প্রতিটি বাক্য ও কর্মের বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে তাদেরকে বুঝাতে থাকবে যে, এর মধ্যে অভিযোগ করার মতো তেমন কোন বিষয় নেইএ কথাগুলি সম্মুখে রেখে চিন্তা করলে সহজেই উপলব্ধি করা যাবে যে, দায়িত্বশীলদের সমালোচনার ব্যাপারে ন্যায় সংগত পন্থা অবলম্বন করতে হলে যথেষ্ট সতর্ক হতে হবেআর এ ব্যাপারে সতর্ক না হলে সমালোচনার অধিকারকে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করে কর্মীরা সংগঠনের জন্য মারাত্মক ক্ষতিতে পরিণত হতে পারেন এবং এর ফলে তাদের নিজেদের পরিণামও হতে পারে অত্যন্ত ভয়াবহ

অন্যায় সমালোচনার একটি বড় আলামত হচ্ছে এই যে, তা আনুগত্যের পথে বাঁধা সৃষ্টি করেকোন ব্যক্তি এ পথে পা বাড়াবার পর প্রকাশ্য অন্যায় আচরণে লিপ্ত হয়কাজেই আনুগত্য ও সমালোচনার পৃথক পৃথক সীমানা রয়েছে এবং নিজেদের সীমানার মধ্যেই তাদের অবস্থান করা উচিতআল্লাহর নাফরমানী ছাড়া আর কোন বস্তু আনুগত্যকে খতম করতে পারে না

ব্যক্তির পরিবর্তনের কারণে আনুগত্য ব্যবস্থাকে মেনে চলার ক্ষেত্রে কোন প্রকার পরিবর্তন আসতে পারে না হতে পারে, কোন আন্দোলনের ব্যাপকতর অবস্থায় দায়িত্ব গ্রহণকারী একটি বড় দলের ব্যক্তিবর্গের মধ্যে কতক উচ্চমানের, কতক নিম্নমানের, কারুর জ্ঞান অধিক, কারুর তাকওয়া অধিক, কেউ বর্তমান যুগের বিশেষ বিষয়সমূহে অধিক পারদর্শী, কেউ প্রথম যুগের অবস্থা সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখেন, কেউ নির্দেশাবলীর বাহ্যিক বিষয়সমূহ সম্পর্কে অধিক অবগত, আবার কেউ নির্দেশাবলীর আভ্যন্তরীণ তত্ত্বজ্ঞানের অধিকারী, কারুর নিকট আন্দোলনের একটি দিক অধিক গুরুত্বপূর্ণ, আবার কারো নিকট অন্য একটি দিকও গুরুত্বের অধিকারীআবার এমনও হতে পারে যে, কারুর মেজাজ একটু কঠোর, কারুর কোমল, কেউ অত্যাধিক নিঃসংকোচ ভাবকে পছন্দ করেন আবার কেউ একটু ভরিক্কি ধরণের গাম্ভীর্যপূর্ণ ব্যবহারে অভ্যস্ত, কেউ অত্যধিক বাকপটুতাকে পছন্দ করেন, আবার কেউ নীরবে কাজ করার পক্ষপাতি

এছাড়াও পোশাক-পরিচ্ছদ, আহার-বিহার, চলা-ফিরা, উঠা বসা প্রভৃতি জীবনের বিভিন্ন ব্যাপারে বিভিন্ন ব্যক্তির রুচি বিভিন্ন হতে পারেব্যক্তিগত রুচি, প্রকৃতি ও প্রবণতা একটি দলীয় ব্যবস্থার সামগ্রিক নীতির ঐক্য সত্ত্বেও একটি বিশেষ পর্যায় পর্যন্ত নিজের কাজ করে থাকেএই পার্থক্য ও বিভিন্নতার কারণে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের অবস্থার মধ্যে এমন কোন পার্থক্য সূচিত হয় না, যার ফলে তাঁদের আনুগত্যের অধিকারের মধ্যে কম-বেশী করা যেতে পারে এবং তাঁদের মধ্যে কোন রদবদল হলে লোকেরা অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হতে পারে যে, অমুক ব্যক্তির মধ্যে যে রুচি ও মননশীলতা ছিল তা অমুক ব্যক্তির মধ্যে নেই কেন? কোন এক ধরণের ব্যবহার ও কর্মপদ্ধতিতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠার পর যদি কোন রদবদল অনুষ্ঠিত হয় তাহলে মনের মধ্যে অস্থিরতা দেখা দেয় এবং কর্মের গতি মন্থর হয়ে পড়েএই অনাসৃষ্টির দূয়ার বন্ধ করার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) হেদায়েত দিয়েছিলেন যে, একজন নাককাটা হাবশীকেও যদি তোমাদের ইমাম করা হয় তাহলে তাঁর নির্দেশ শ্রবণ করো এবং তাঁর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য করো এক্ষেত্রে তাঁর চেহারা সুরত লেবাস-পোশাক রুচি প্রকৃতির দিকে দৃষ্টিপাত করো নাদায়িত্বশীলদের ব্যক্তিগত রুচি, প্রকৃতি সকল দিক দিয়ে অনুগতদের চাহিদানুযায়ী হবে, এ বিষয়টির উপর শরিয়ত আনুগত্যকে নির্ভরশীল করেনি

ইসলামী আন্দোলন ব্যক্তিত্বের চর্তুদিকে আবর্তিত হয় নাবরং এ আন্দোলন এক সময় রাসূলুল্লাহর (স) নেতৃত্বে চলতে থাকে এবং অন্য সময় হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা) কুরআনের এ বাণী-
وَمَا مُحَمّدٌ اِلاَ رَسـولٌ مِن قـَـبلـِهِ الـرّسـَلُ اَفَـائـن مـَاتَ اَوقُـتـِلَ انـقـَلَـبـتـُم عَـلـَيَ اَعـقـَاَبِـكُـم-
সূরা আলে ইমরান, আয়াতঃ১৪৪

(অর্থামুহাম্মদ (স) একজন রাসূল মাত্র ছিলেনতাঁর পূর্বে আরো বহু রাসূল অতিক্রান্ত হয়েছেন, যদি তিনি মরে যান বা নিহত হন তাহলে কি আবার তোমরা পিছনের দিকে ফিরে যাবে?”) উচ্চারণ করে অগ্রসর হন এবং আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহন করেনতারপর হযরত ওমর (রা) এর ন্যায় কঠোর হৃদয়ের ব্যক্তি নেতৃত্ব লাভ করেনঅতঃপর হযরত উসমানের (রাঃ) মত কোমল হৃদয়ের সহনশীল ব্যক্তি এ দায়িত্ব গ্রহণ করেনতারপর হযরত আলী (রাঃ) তাঁর বিশেষ গুনাবলীসহ এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দান করেনএই সমস্ত হাত বদলের মধ্যে অবশ্যই আনুগত্য ব্যবস্থার অপরিহার্যতা বহাল থাকে এবং এ ব্যবস্থা ভঙ্গ করা হামেশা কবীরা গোনাহর অর্ন্তভূক্ত থাকে

মনে রাখবেন, আমাদেরকে ব্যক্তিত্বকে সম্মুখে রেখে শৃঙ্খলার আনুগত্য করার জন্য নয় বরং শরীয়ত বিভিন্ন দায়িত্বকে যে মর্যাদা দান করেছে তাকে সম্মুখে রেখে শৃঙ্খলার আনুগত্য করার নির্দেশ দেয়া হয়েছেকাজেই প্রয়োজন ও পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রতিদিন ব্যক্তি বদল হতে থাকলেও, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (স) আমাদের উপর দায়িত্বশীলদের যে সকল অধিকার দান করেছেন পূর্ণ সততার সাথে আমাদের সেগুলি আদায় করা উচিত

এ পর্যন্ত কেবল কর্মীদের দায়িত্ব বিবৃত করা হয়েছেএদের তুলনায় কর্তৃত্বশীলদের দায়িত্ব অনেক বেশী নাজুক প্রকৃতিরকর্তৃত্বশীলগণ তাঁদের দায়িত্ব পুরোপুরি পালন না করা পর্যন্ত কর্তৃত্ব ও আনুগত্য ব্যবস্থার মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকতে পারে নাকর্মীদের মোকাবেলায় নেতাদের পরকালীন জবাবদিহিও অনেক কঠিন হবেদুনিয়ায় ইসলামী আন্দোলনের সাফল্যের সিংহভাগও তাঁদের সঠিক ও যথার্থ কর্মের উপর নির্ভর করেকর্মীরা তখনই যথার্থ আনুগত্য করতে পারে যখন নেতৃবৃন্দ তাঁদের নিজেদের অংশের কর্তব্য অর্থা কর্তৃত্বের ব্যাপারে তাঁদের নিজেদের দায়িত্ব পুরোপুরি আদায় করেএ ব্যাপারে নিম্নলিখিত আয়াতটি থেকে চমকার নির্দেশ পাওয়া যায়এখানে আল্লাহতায়ালা রাসূলুল্লাহর (স) কর্তৃত্বের স্বরূপ নিন্মোক্ত ভাষায় ব্যক্ত করেছেনঃ
فـَـبِمَـا رَحـمـَةٍ مَّنَ اَللهِ لِـنـتَ لـَهـُم وَلـَو كَـنـتَ فـَظـاًّ غَـلـِظَ الـقـَلـبِ لاَنـفتَضـُّوا مِن حَـولِــكَ فـَاعـفُ عَـنـهُـم وَاسـتـَغـفـِرلَـهُـم وَشَـاوِرهُـم فِـى الاَمـرِ فَـاِذاَ عـَزَمـتَ فـَتـَوَكّـل عَـلـَىَ اللهِ اَِنَّ اَللهَ يُـحِـبُّ الـمُـتـَوَكّـِلـِيـنَ-
এটা একমাত্র আল্লাহর অনুগ্রহ যে, আপনি এদের (মুসলমানদের) প্রতি কোমলযদি আপনি কঠোর ভাষী ও তিক্ত মেজাজ সম্পন্ন হতেন, তাহলে এরা আপনার চারপাশ থেকে বিক্ষিপ্ত হয়ে যেতোকাজেই এদের ত্রুটিকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখুন, এদের জন্য সাফায়াত চান এবং বিভিন্ন বিষয়ে এদের সাথে পরামর্শ করুনঅতঃপর পরামর্শের পর যখন কোন বিষয়ে দৃঢ় সংকল্প হয়ে যায়, তখন আল্লাহর উপর ভরসা করুননিশ্চয়ই আল্লাহ (তাঁর উপর) ভরসাকারীদের ভালবাসেন” -সূরা আলে ইমরান, আয়তঃ১৫৯

এই আয়াতে রাসূলুল্লাহর (স) আনুগত্যকারী প্রত্যেকটি কর্তৃত্বশীল ব্যক্তির জন্য এমন একটি মৌলিক বিধান দান করা হয়েছে যার অনুপস্থিতিতে কোন দলীয় শৃঙ্খলা যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারে নাসংগঠনের অর্ন্তভূক্ত প্রত্যেকটি ব্যক্তিকে এই আয়াতের আলোকে যে সমস্ত বিষয়ের অনুগত থাকা উচিত এবং যে বিষয়কে সম্মুখে রেখে নিজের স্বভাব-চরিত্র মেজাজ গড়ে তোলা উচিত তা নিম্নে বর্ণিত হলোঃ

ক. ব্যক্তি যেন কোন প্রকার বড়-ছোট, উঁচু-নীচু ভেদাভেদ অনুভব না করেএ পরিবেশ যেখানে নেই সেখানে কর্তৃত্বশীল ও অনুগতদের মধ্যে মানসিক, আন্তরিকও বৈঠকী ব্যবধান সৃষ্টি হয় এবং সহযোগিতার প্রাণশক্তি দুর্বল হয়ে পড়েএ মহা সত্যটিকে আল্লামা ইকবাল তাঁর কবিতায় এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ

কাফেলার সারি হতে
বিচ্ছিন্ন হলো কেউ,
সংশয়িত হলো কেউ
হারেমের প্রতি,
কেননা ব্যবহার প্রীতিপূর্ণ নয়
আমাদের কাফেলা সালারের

সংশ্লিষ্ট আয়াতটি এই প্রীতিপূর্ণ ব্যবহারই দাবী করে

এই প্রীতিপূর্ণ ব্যবহারের অর্থ এই নয় যে, দায়িত্বশীল ব্যক্তি কোন ব্যাপারে কঠোর হবেন না, কোন ভুলত্রুটির জন্য কৈফিয়ত চাইবেন না, কোন অন্যায় কাজে বাঁধা দিতে পারবেন না, উপরন্তু প্রত্যেকটি কর্মীর তোষামোদ করে ফিরবেনবরং পরিস্থিতি ও পরিবেশ অনুযায়ী কোথাও কঠোর নীতি অবলম্বন করার প্রয়োজন হলে সেখানে তা না করলে আন্দোলনের জন্য ক্ষতিকর হবেআদর্শ, উদ্দেশ্য ও শৃঙ্খলার খাতিরে দায়িত্বশীলদেরকে কখনো কখনো সহযোগীদের সাথে আদেশের সুরে কথা বলতে হয়, কাজ আদায় করতে হয়কিন্তু সে আদেশে থাকবে স্নেহ প্রীতির প্রাণ প্রবাহতার বাইরের কঠোরতা নেহায়েত একটা খোলস বৈ আর কিছুই নয়

খ. দায়িত্বশীলগন সকল সহযোগীর উঠা-বসা, চাল-চলন, আচার-ব্যবহার, হাব-ভাব প্রভৃতি গভীরভাবে নিরীক্ষণ করার সুযোগ পানকাজেই তাদের অনেক দোষ-ত্রুটি, দুর্বলতা, গলদ তাঁদের সম্মুখে থাকেহয়ত কেউ কর্তব্য পালনে গাফলতি করেছে, কেউ আন্দোলনের বিরোধীদেরকে কোন অপ্রীতিকর কথা বলেছে, কেউ ত্রুটিপূর্ণ আবেগ প্রকাশ করেছে, কেউ সর্বসমক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গোপন কথা প্রকাশ করে দিয়েছে, কেউ নিজের সহযোগী বা অন্যের সাথে অন্যায় আচরণ বরেছে, কেউ গীবত করেছে, কেউ কারুর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে

এ সমস্ত বিষয় সামনে থাকার কারণে মানুষের মনে কুধারণা, তিক্ততা ও বিরক্তি সৃষ্টি না হয়ে পারে নাএ ধরণের দুর্বলতা দেখে ধীরে ধীরে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের মন বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিদের সম্পর্কে এবং নিজেদের সমগ্র দলটি সম্পর্কেও তিক্ত হয়ে ওঠেতখন কঠোর কিন্তু কর্কশ ব্যবহার ও কথাবার্তার মাধ্যমে এক ধরণের বিরক্তি ফুটে উঠতে থাকেএর ফলে মন ভেঙ্গে যায়, সন্দেহ-সংশয়ের পরিধি বেড়ে যায় এবং কর্তৃত্ব ও আনুগত্যের বাঁধন ঢিলে হতে থাকেপূর্বোল্লেখিত আয়াতটি এ ব্যাপারে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেএর মাধ্যমে কর্তৃত্বশীলদেরকে শিক্ষা দেয়া হয়েছে ঃ নিজের সহযোগীদের দুর্বলতাগুলি দেখো এবং সেগুলি মাফ করে দাও, এজন্য মনকে কলুষিত করো না এবং নিরাশ হয়ো নাকারণ বিভিন্ন মানুষের মধ্যে বিভিন্ন প্রকার দুর্বলতা আছে অনেক প্রচেষ্টা, মেহনতের পর ধীরে ধীরে এগুলি দূরীভূত হয়কেবল তাদেরকে মাফ করে দেওয়াই যথেষ্ট নয় বরং স্নেহ প্রীতির তাগিদে অনুপস্থিতিতে তাদের জন্য আল্লাহর কাছে মাগফেরাত চাইতে হবেএটিই হচ্ছে পারস্পরিক প্রীতির সম্পর্ক শক্তিশালী করার সর্বত্তোম উপায়

গ. আর বিভিন্ন বিষয়ে তাদের সাথে পরামর্শ করো’-নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সময়ে সময়ে এবং প্রয়োজনবশতঃ নিজেদের বিভিন্ন সহযোগীর সাথে তাদের বুদ্ধি-বিচক্ষণতা, জ্ঞান ও তাকওয়া অনুযায়ী পরামর্শ করা উচিত পরামর্শের মাধ্যমে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি পায়, সন্দেহ-সংশয় দূরীভূত হয় এবং সিদ্ধান্তকে কার্যকরী করা সহজ হয়

পরামর্শ করা অবশ্যই ফরজযে ব্যাপারে যে সহযোগী সঠিক পরামর্শ দেয়ার যোগ্যতা রাখে সে ব্যাপারে তার সাথে পরামর্শ করাই হচ্ছে আল্লাহর নির্দেশ প্রত্যেক ব্যাপারে প্রত্যেক ব্যক্তির সাথে পরামর্শ করা জরুরী নয় বরং যে ব্যক্তির সাথে পরামর্শ করা সঙ্গত তার সাথে অবশ্য সে ব্যাপারে পরামর্শ করা উচিতঅনেক সময় বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিদের সাথে, অনেক সময় কেবল নির্বাচিতকার্যকরী পরিষদএর সাথে আবার অনেক সময় সাধারণ সদস্য ও সহযোগীদের সাথে পরামর্শ করা, অতঃপর তাদের মতামত সম্পর্কে চিন্তা ও বিচার-বিশ্লেষন করা দ্বীনকে প্রতিষ্টিত করার প্রচেষ্টা ও সংগ্রামকে শক্তিশালী করেউপরন্তু এর সাহায্যে দলীয় সংগঠন মজবুত হয়পরামর্শের মাধ্যমে বিভিন্ন মন মস্তিষ্কের মিলন ঘটে, তাদের মধ্যে ঐক্য সংস্থাপিত হয় এবং তারা বিভিন্ন বিষয়ে গৃহীতব্য সিদ্ধান্তকে কার্যকরী করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে

ঘ. কর্তৃত্বশীলদের জন্য আল্লাহ তায়ালা এই আয়াতের মধ্যে যে সর্বশেষ নির্দেশ দিয়েছেন, তা হচ্ছে এই যে, প্রয়োজনীয় পরামর্শের পর যখন কোন বিষয়ে স্থির সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় তখন একাগ্রচিত্তে তার উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকা উচিতএকটি দলের দায়িত্বশীলদের প্রতিদিনকার বিভিন্ন বিক্ষিপ্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হবার পরও মতবিরোধের সম্মুখীন হতে হয় এবং অনাবরত নতুন নতুন মতামত তাঁদের সম্মুখে আসতে থাকেকিন্তু স্থিরীকৃত বিষয়ে যদি বরাবর রদবদল করা হয় তাহলে সে ব্যাপারে সাফল্যের সাথে কোন একটি দিকে অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয় বরং উল্টা দায়িত্বশীলদের মনে ইতস্তত ও চিন্তার নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়এর ফলে দলের সামগ্রিক নীতিও স্থায়ী অস্থিরতার শিকার হয়এ সমস্ত কারণে যথারীতি একটি পরিণতিতে পৌছে যাবার পর আল্লাহ তায়ালা পরামর্শদানকারী ব্যক্তিদেরকে স্থিরীকৃত বিষয়সমূহ মেনে নিয়ে নিজেদের বাস্তব দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছেন

কর্তৃত্ব ও আনুগত্য সম্পর্কে আরো বক্তব্য হচ্ছে এই যেঃ

ক. বিভিন্ন দায়িত্বশীল ব্যক্তির পক্ষ থেকে যে সমস্ত সার্কুলার ও নির্দেশনামা জারি করা হয় সাধারণত সেগুলির আনুগত্যের ব্যাপারে শরিয়ত নির্ধারিত অপরিহার্যতার অনুভূতি কিছুটা দুর্বলএই সার্কুলার ও নির্দেশগুলিকে সম্ভবত অফিস-আদালতের মামুলি সার্কুলার মনে করা হয়অথচ যখনই কোন সার্কুলার জারি করা হয় তার অবস্থা হয় ঠিক আমর বিল মারুফ’ (কর্মের আদেশ দান)-এর সমতুল্যএ ব্যাপারে উলিল আমরের (কর্তৃত্বশীলদের) আনুগত্যকে অপরিহার্য গণ্য করা হয়েছেসার্কুলারগুলির প্রতিটি শব্দ সম্পর্কে ভালভাবে চিন্তা করা উচিত এবং যে বন্দেগীর প্রেরণা নিয়ে শরয়িতের সমস্ত বিধি-নিষেধ পালন করা হয় সেই প্রেরনা সহকারে যথাসময়ে সেগুলিকে কার্যকরী করার জন্য নিজের সমগ্র শক্তি নিয়োগ করা উচিত

খ. সভায় উপস্থিতির জন্য যে সময় নির্ধারিত করা হয়, কোন ডিউটিতে পৌছাবার জন্য যে সময়-কাল স্থিরীকৃত হয়, অনুরুপভাবে কোন সংবাদ বা রিপোর্ট পৌছাবার বা কোন হুকুম তামিল করার জন্য যে পদ্ধতি বা সময় নির্ধারিত হয়, তা যথাযথভাবে মেনে চলার যোগ্যতা এখনো আমাদের মধ্যে সৃষ্টি হয় নি

লোকেরা এখনো এ দায়িত্ব পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারছে না যে, তাদের প্রত্যেকেই একটি ঘূর্ণায়মান মেশিনের কলকব্জা স্বরূপ এবং প্রতিটি কলকব্জা যদি নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করতে বিলম্ব করে অথবা অনিয়ম করে তাহলে সমগ্র মেশিনটাই যথাসময়ে কাজ করতে ব্যর্থ হবেএ পঙ্গুত্বসহ আমরা কোন বড় অভিযানে সফল হতে পারবো নাকাজেই আমাদের প্রত্যেকেরই সংগঠন-মেশিনের কলকব্জার ন্যায় যথা নিয়মে কাজ করার জন্য নিজেদেরকে তৈরী করা উচিত

গ. কর্তৃত্ব ও শৃঙ্খলা ব্যবস্থার আনুগত্যে ত্রুটি-বিচ্যুতি যে একটি গোনাহর শামিল উপরের আলোচনায় এ কথা সুস্পষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছেএজন্য সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে আমাদেরকে জবাবদিহী করতে হবেকিন্তু মনে হয়, ধরণের ত্রুটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করলে সহযোগীরা কিছুটা লজ্জিত হয় ঠিকই, তবে এ জন্য তাদের মধ্যে সাধারণভাবে যে ধরণের গুনাহর অনুভূতি হওয়া দরকার তা হয় নাদলীয় শৃঙ্খলার আনুগত্যে ত্রুটি করা-মিথ্যা বলা, কাউকে গালি দেয়া, ওয়াদা ভঙ্গ করা, কারুর অধিকার আত্মসা করা, চুরি করা, গীবত করা, মিথ্যা সাক্ষী দেয়া এবং এ ধরণের অন্যান্য বড় বড় অপরাধের চাইতে কম পর্যায়ের নয় কিন্তু বড়ই আশ্চ্যর্য ব্যাপার ব্যক্তিগত চরিত্রের নীতি বিরোধী উপরোল্লেখিত কাজগুলি করার সঙ্গে সঙ্গেই মনে খটকা লাগে এবং আল্লাহর নিকট তওবা ও ইস্তেগফার করার প্রেরণা জাগে, অথচ দলীয় চরিত্রনীতি বিধ্বস্ত হবার পর এমন গোনাহগারীর কোন অনুতাপের ভাব মনের মধ্যে সৃষ্টি হয় না যার ফলে সঙ্গে সঙ্গেই তওবা ও ইস্তেগফার করে নিজের কার্যাবলী সংশোধন ও ক্ষতিপূরণ করা যেতে পারে

দলীয় চরিত্রের মূল্য ব্যক্তিগত চরিত্রের চাইতে অনেক বেশীএ জন্যই দলীয় চরিত্রে দুর্বলতার প্রকাশ বৃহত্তর গোনাহআমাদের সহযোগীদের এ বিষযটি অনুভব করা উচিতআরো যদি সংগঠন কর্তৃক অর্পিত কোন দায়িত্ব সম্পাদন করতে, কোন কাজের জন্য সময় বের করতে, কোন নির্দিষ্ট স্থানে যথাসময়ে পৌঁছতে অথবা অন্যদিকে দায়িত্বশীলদের অধিকার আদায় করতে, তাঁদের কল্যাণ কামনার দাবী পূরণ করতে, সঠিক সমালোচনা পদ্ধতি অবলম্বন করতে, পরামর্শ ও তথ্যদান করতে, গোপনীয়তা রক্ষার অধিকার আদায় করতে বা দায়িত্বশীলদের নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করতে কোন প্রকার ত্রুটি করে; তাহলে এমনি ধরণের প্রত্যেকটি ত্রুটির পর আমাদের মনে চরম লজ্জানুভূতি সৃষ্টি হওয়া প্রয়োজনএমন লজ্জানুভূতি সৃষ্টি হবে যা আমাদের তওবা ইস্তেগফারের দিকে ঝুঁকিয়ে দিবে, রাব্বুল আলামীনের সম্মুখে আমাদের দীনতার শির নত করে দিবে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃত্বশীল বা সহযোগীদের নিকট ওজর পেশ করা ও ক্ষমা চাওয়ার জন্য আমাদের মধ্যে অধিকতর কর্মতপরতা সৃষ্টি করবে এবং আমাদের আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় করার প্রেরণা জাগাবে
আমাদের মধ্যে এ গুণ সৃষ্টি না হলে ইসলাম নির্ধারিত পথে নিজেদের সংগঠন ও শৃঙ্খলার বিকাশ সাধনও আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়

ঘ. কর্তৃত্ব ও আনুগত্যের উপরোল্লেখিত দাবীসমূহ পূরণ করার জন্য নিছক আবেদন বা কতিপয় গণতান্ত্রিক ও শাসনতান্ত্রিক ধারা যথেষ্ট নয়বরং একমাত্র সহযোগীদের দায়িত্বানুভূতিই এ দাবীগুলির পূর্ণতার ধারক হতে পারেযদি প্রত্যেক সহযোগী আন্দোলনের সাথে সম্পর্ক কায়েম করে মুমনিদেরকে সাক্ষী রেখে আল্লাহর নিকট যে অঙ্গীকার করেছে তা সব সময় মনের মধ্যে জাগরুক রাখে, তাহলে তাদের মাঝে এ দায়িত্বানুভূতি জাগ্রত থাকতে পারেএই অনুভূতির তাগিদে প্রত্যেক সহযোগীকে এ কথা মনে রাখা দরকার যে, সংগঠন শৃঙ্খলা হচ্ছে আল্লাহ ও তার রাসূলের পক্ষ থেকে একটি আমানত এবং তার সাথীদের ন্যায় তাকেও এর প্রহরায় ও রক্ষনাবেক্ষনে নিযুক্ত করা হয়েছেএটি একটি মহামূল্যবান আমানতএই আমানতটিকে অস্তিত্ব দান করার জন্য ইতিহাসের বিভিন্ন যুগে হাজার হাজার শক্তি কাজ করেছে এবং এর পিছনে বহু চিন্তা-গবেষণা, শ্রম, অর্থ, নিদ্রাহীনতা, প্রচেষ্টা, সংগ্রাম ও ত্যাগ রয়েছেকাজেই কোন ব্যক্তি যদি এই শৃঙ্খলায় কোন প্রকার দুর্বলতা সৃষ্টি করার চেষ্টা করে তাহলে তার হস্তপে থেকে এ আমানতকে রক্ষা করা প্রত্যেক সহযোগীর প্রাথমিক দায়িত্বএই দায়িত্ব সম্পাদনে যারাই ত্রুটি করবে তারাই সেই পাহারাদারের ভূমিকা গ্রহণ করবে নিজের কাজে ফাঁকি দেয়

কাজেই সহযোগীদের উচিত এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করা এবং এমন একটি ঐতিহ্য সৃষ্টি করার জন্য অবিশ্রাম প্রচেষ্টা চালানো, যার ফলে শৃঙ্খলার উপর প্রভাব বিস্তারকারী কোন ক্ষতিকর বস্তু মাথা উচু করতে না পারেআর কোন অপ্রীতিকর বস্তু মাথা উঁচু করলেও যেখানে মাথা উঁচু করে সেখানেই যেন তাকে ভালভাবে দাবিয়ে দেয়া যায়একমাত্র এ পদ্ধতিতেই কর্তৃত্বশালী ও আনুগত্যকারীরা স্ব স্ব স্থানে অবস্থান করে কুরআন ও সুন্নাহর দাবী অনুযায়ী অগ্রসর হতে পারে

সহযোগীদের সাথে সম্পর্ক

যে সমষ্টিগত পরিবেশে ব্যক্তিদের পারস্পরিক সম্পর্ক যথার্থ নৈতিক ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয় একমাত্র সেখানেই ইসলামের চাহিদা অনুযায়ী কর্তৃত্ব ও আনুগত্য যথাযথভাবে প্রবর্তিত হতে পারেএই নৈতিক ভিত্তিগুলিকে আল্লাহ তাঁর রাসূল (স) দ্বারা যথাযথভাবে নির্ধারণ করেছেনবিশেষ করে সূরায়ে হুজরাতে এই গুরুত্বপূর্ণ নীতিগুলি সংক্ষেপে বিবৃত করা হয়েছেইসলামী সমাজ ও ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের এগুলি সম্মুখে রাখা প্রয়োজনএইখানে আমি সংক্ষেপে এর উল্লেখ করছিঃ

সমাজ জীবনকে ত্রুটিশূন্য রাখার জন্য প্রথম নির্দেশ হচ্ছেঃ
يــَااَيـهـاَ الـَّذِيـنَ اَمَنـُوا اِن جــاَءَكُـم فــاَسـِقٌ بـِـنَـبـاَءٍ فَـتـَبـيـَنـُوا اَن تَـًصِيـبُوا قـَومـأً بِـجـَهـأَ لَـةٍ فـَتـُصـبـِحـُوا عَـلـىَ مَـا فـَعَـلـتـُم نَـدِمـِيـنَ-
হে ঈমানদারগণ! যদি কোন ফাসেক ব্যক্তি তোমাদের নিকট কোন খবর নিয়ে আসে, তাহলে (সে সম্পর্কে চিন্তা গ্রহণের পূর্বে) অনুসন্ধান করো, যাতে করে তোমরা অজ্ঞাতে (বিক্ষুদ্ধ হয়ে) কোন দলের ওপর আক্রমন না করো এবং পরে এ জন্য পস্তাতে না হয়” - সূরা হুজরাত, আয়াতঃ ৬

কোন খবর বা বিবরণ শুনার পর সঙ্গে সঙ্গেই সে সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা অনেক সময় মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করেএই ধরণের ভুলের কারণে পরে লজ্জিত হতে হয়এ নির্দেশটি অত্যন্ত ব্যাপকইসলামী সমাজের সদস্যদের এর ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকা উচিতফাসেকদের প্রদত্ত খবরে পরস্পরের সম্পর্কে তড়ি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত নয়

দ্বিতীয় নির্দেশ হচ্ছেঃ
اِنَّـمـاَ المُـؤمِنـُونَ اِخوأَةٌ فَـاَصـلِحـُوا بَـيـنَ اَخَـوَيـكَـُم-
ঈমানদারেরা পরস্পর ভাই ভাইকাজেই নিজের ভাইদের মধ্যে সদ্ভাব প্রতিষ্ঠিত করো” - সূরা হুজরাত, আয়াতঃ১০

এ নির্দেশটির উদ্দেশ্য অত্যন্ত পরিস্কারমুসলিম সমাজের সদস্যদের মধ্যে মানবিক দুর্বলতার কারণে যদি কখনো মনোমালিন্য, ঝগড়া-বিবাদ দেখা দেয়, তাহলে ফেতনাকে আরো ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বড় করা অন্য ভাইদের কাজ নয়বরং তাদের কাজ হচ্ছে সন্দেহ-সংশয় দূর করা, বিবাদমান পক্ষদ্বয়কে নিকটতর করা এবং উত্তেজনা প্রশমিত করার জন্য চেষ্টা চালানো, যার ফলে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক পূনর্বহাল হতে পারেকেননা এই ভ্রাতৃত্ব ছাড়া ইসলামী দলের সংগঠন শৃঙ্খলা কোন দিন মজবুত হতে পারে না

তৃতীয় নির্দেশ হচ্ছেঃ
يـَاَ يـُّهـاَ الـّذِيـنَ اَمَـنـُوا لأَ يَـسـخَـر قـَومٌ مِّـن قـَومٍ عَـسـىَ اَن يـَّكُـونـُوا خَـيـراً مـِّنـهـُم- وَلاَ نـِسـأءٌ مِّـن نـِسـأءٍ عَـسـىَ اَن يـَّكُـنَّ خَـيـراً مـَّنـهـُنَّ- وَلاَ تَـلمِزُوا اَنـفـُسـَكُـم وَلاَ تَـنـاَ بَـزُوا بـِالاَلـقَـَابِ- بـِئـس الاَِ سـمُ الغُـسـُوقُ بـَعـدَ الاِيـمـأَنِ- وَ مَـن لَّـم يَـتـُب فَـاُولــئـكَ هـُمُ الظاَّلِـمـُونَ-

হে ঈমানদারগন! তোমাদের একদল যেন অন্য দলের প্রতি বিদ্রুপ না করে, কেননা হতে পারে তারা এদের তুলনায় ভালো লোকআর তোমাদের মেয়েরা যেন অন্য মেয়েদের বিদ্রুপ না করে, কেননা হতে পারে তারা এদের তুলনায় ভালো আর তোমরা পরস্পরের দোষ খুঁজে বেড়িয়ো না, পরস্পরের জন্য অসম্মান জনক নাম ব্যবহার করো নাকেউ ঈমান আনার পর তাকে মন্দ নামে ডাকা গোনাহ্ এসব কাজ থেকে যারা তওবা করে না তারা জালেমসূরা হুজরাত, আয়তঃ১১

এ নির্দেশের মাধ্যমে বিদ্রুপ করা, পরস্পরের দোষ খুঁজে বেড়ানো এবং অসম্মানজনক নাম ব্যবহার করা থেকে মুসলমানকে বিরত রাখা হয়েছে এবং এজন্য সতর্কবাণী শুনানো হয়েছে যে, যারা এ অভ্যাস পরিত্যাগ করবে না তারা স মুমিনদের দলভূক্ত হবে না, বরং তারা হবে জালেমদের দলভূক্ত এ দোষগুলি সমাজদেহে ঘুণ ধরিয়ে দেয়এই ছোট দোষগুলি মনে ভাঙ্গন ধরায়যে দলে ঠাট্টা-বিদ্রুপ, কটাক্ষ, মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন করা, অসম্মান করা প্রভৃতি রোগ সৃষ্টি হয় সে দল কখনো ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের উন্নততর পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারে না আমাদের প্রত্যেক কর্মীর এই রোগসমূহ খেকে মুক্ত থাকার জন্য চেষ্টা করা উচিত

চতুর্থ নির্দেশ হচ্ছেঃ يـَاَ يـُّهـاَ الـّذِيـنَ اَمَـنـُوا اِجـتَنـِبـُوا كــثـَيـِراً مِّنَ الـظَّـنِّ- اِنَّ بَـعـضَ الـظّـنِّ اِثـمٌ- وَلاَ تـَجَـسّـَسُـوا وَلاَ يـَغـتـَب بـَعـضُـكُـم بـَعـضاـً أيـُبُّ اَحـَدُكُـم اَن يّـَأكُـلُ لَـحـمَ اَخِـيـهِ مـَيـتاً فَـكَـرِهـتـُمُوهُ- وَاتَـقُـوااللهَ- اِنَّ اللهَ تَوَّابٌ رَّحِـيـمٌ-

হে ঈমানদারগণ! খুব বেশী কু-ধারণা পোষন থেকে বিরত থাককেননা অনেক কু-ধারণা গোনাহর নামন্তরঅন্যের অবস্থা জানার জন্য গোয়েন্দাগীরি করো না এবং কারুর গীবত করো নাতোমাদের কেউ কি নিজের মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া পছন্দ করবে? (না, করবে না) বরং তোমরা তা ঘৃণা করোআল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুলকারী ও দয়াময়সুরা হুজরাত, আয়াতঃ১২

এ আয়াতটির প্রথম দাবী হচ্ছে এই যে, মুসলিম দলের সদস্যদের পরস্পরের সম্পর্কে কু-ধারণা করা যাবে নামনের মাটিতে সন্দে-সংশয়ের বীজ বপন করা যাবে নাপরস্পরের বিরুদ্ধে দোষারোপ করা এবং এদিক-ওদিক থেকে শুনে শুনে কারুর বিরুদ্ধে দোষের পাহাড় গড়ে তোলা যাবে না, কেননা প্রত্যেকটি ভিত্তিহীন সন্দেহ-সংশয় ও দোষারোপ আসলে একটি গোনাহ

এর দ্বিতীয় দাবী হচ্ছে এই যে, পরস্পরের গোপনীয়তা জানার জন্য গোয়েন্দাগীরি করা যাবে নাগোয়েন্দাগীরির অর্থ এই যে, পরস্পরের দোষ খুঁজে বেড়ানো বা গোপন কথা জানার জন্য সর্বত্র ঢু-মারা অথবা বিভিন্ন মজলিসের ভেতরের কথা জানার জন্য তপর থাকাএগুলি অত্যন্ত দোষনীয় এবং শৃঙ্খলার জন্য ধ্বংসকর

এর তৃতীয় দাবী হচ্ছে এই যে, একজনের অনুপস্থিতিতে অন্যের দোষ বর্ণনা করে আনন্দ উপভোগ করা যাবে নাকেননা এটা মারাত্মক অপরাধএটা হচ্ছে যে ব্যক্তির গীবত করা হয় তার গোশত কেঁটে খাওয়ার তুল্য ঘৃণ্য অপরাধমূলক কাজ এই দাবীগুলোর প্রতি যত অধিক নজর রাখা হবে ততই আন্দোলনের ঐক্য ও সহযোগীদের ভ্রাতৃত্ব শক্তিশালী হবে এবং কর্তৃত্ব ও আনুগত্য ব্যবস্থা যথাযথভাবে কাজ করতে সক্ষম হবে

দলীয় চরিত্রের সাথে সম্পর্কিত আরো কতিপয় বিষয় সূরায়ে হুজরাতে আছেআপনারা ইচ্ছা করলে সেগুলি সম্পর্কেও চিন্তা করতে পারেনএখানে মাত্র কতিপয় সুস্পষ্ট নৈতিক দাবী পেশ করা হলো

পরিশেষে বলা যায়, যদি আমরা আল্লাহর সাথে সম্পর্ক কায়েমের যথাযথ ব্যবস্থা করে দলীয় নীতি ও শৃঙ্খলার আনুগত্য করি এবং উল্লেখিত নৈতিক গুনাবলী নিজেদের মধ্যে সৃষ্টি করে কর্মক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ি, তাহলে ইনশায়াল্লাহ আমাদের ব্যর্থতার সামান্যতম সম্ভবনাও নেইআল্লাহ যদি আমাদেরকে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবার তিনটি সুযোগ দেন তাহলে বিশ্বাস করুন, আমরা ব্যবসায় যে পুঁজি খাটাচ্ছি তা কয়েকগুণ অধিক মুনাফা দানে সক্ষম হবে

০০০০০০০০০০০০০০০০০০০

কোন মন্তব্য নেই

Deejpilot থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.