দারসূল কোরআনঃ সূরা আনকাবুত ১-১১
কুরআন তাফসিরঃ সূরা আনকাবুত (১-১১)
الم
(১) আলিফ লাম মিম।
أَحَسِبَ النَّاسُ أَن يُتْرَكُوا أَن يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ
(২) মানুষ কি এটা মনে করেছে যে ‘আমরা ঈমান এনেছি’ এ কথা বলার কারনে তাদের স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং তাদের কোন পরীক্ষা করা হবে না ?
وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ ۖ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّـهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِينَ
(৩) প্রকৃতপক্ষে তোমাদের পূর্বের লোকদেরও পরীক্ষা করা হয়েছিলো। এবং নিঃসন্দেহে আল্লাহ (এটি) জানিয়ে দিবেন যে কারা সত্যবাদী এবং এটা জানিয়ে দিবেন যে কারা মিথ্যাবাদী।
أَمْ حَسِبَ الَّذِينَ يَعْمَلُونَ السَّيِّئَاتِ أَن يَسْبِقُونَا ۚ سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ
(৪) অথবা যারা পাপ কাজ করে তারা কি মনে করে যে তারা আমার শাস্তি থেকে পালিয়ে যেতে পারবে ? আমার সম্পর্কে তারা খারাপ ধারণা করলো।
مَن كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ اللَّـهِ فَإِنَّ أَجَلَ اللَّـهِ لَآتٍ ۚ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
(৫) যারা আল্লাহ্র সাথে সাক্ষাত আশা করে (তারা জেনে রাখুক) আল্লাহ্র দেওয়া নির্দিষ্ট সময়টি অবশ্যই আসবে। এবং তিনি সব শুনেন ও জানেন।
وَمَن جَاهَدَ فَإِنَّمَا يُجَاهِدُ لِنَفْسِهِ ۚ إِنَّ اللَّـهَ لَغَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ
(৬) এবং যে ব্যক্তি (আল্লাহ্র জন্য) জিহাদ করে, সে (আসলে) তা নিজের (কল্যাণের) জন্যই করে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ বিশ্বজগৎ থেকে অমুখাপেক্ষী।
وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَنُكَفِّرَنَّ عَنْهُمْ سَيِّئَاتِهِمْ وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَحْسَنَ الَّذِي كَانُوا يَعْمَلُونَ
(৭) এবং যারা ঈমান আনে ও সৎ আমল করে, আমি নিশ্চয়ই তাদের পাপগুলো দূর করে দিব এবং তারা যেসব সৎ আমল করে আমি তাদের সেসব আমলের উত্তম প্রতিদান দিবো।
وَوَصَّيْنَا الْإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ حُسْنًا ۖ وَإِن جَاهَدَاكَ لِتُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا ۚ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ
(৮) এবং আমি মানুষকে তাদের পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার আদেশ দিয়েছি, কিন্তু কখনো যদি তারা তোমাকে আমার সাথে কোন কিছু শরিক করার ব্যাপারে জোর করে যে ব্যাপারে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তখন তাদের আনুগত্য করবে না। আমার কাছেই তোমাদের ফিরে আসতে হবে অতপর আমি তোমাদের জানিয়ে দিবো তোমরা (দুনিয়ার জীবনে) কি করতে।
وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَنُدْخِلَنَّهُمْ فِي الصَّالِحِينَ
(৯) এবং যারা ঈমান আনে এবং সৎ আমল করে, নিশ্চয়ই আমি তাদের ন্যায়নিষ্ঠ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করে নিবো।
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَقُولُ آمَنَّا بِاللَّـهِ فَإِذَا أُوذِيَ فِي اللَّـهِ جَعَلَ فِتْنَةَ النَّاسِ كَعَذَابِ اللَّـهِ وَلَئِن جَاءَ نَصْرٌ مِّن رَّبِّكَ لَيَقُولُنَّ إِنَّا كُنَّا مَعَكُمْ ۚ أَوَلَيْسَ اللَّـهُ بِأَعْلَمَ بِمَا فِي صُدُورِ الْعَالَمِينَ
(১০) এবং মানুষদের মধ্যে এমনও আছে যারা মুখে বলে ‘আমরা আল্লাহ্র উপর ঈমান এনেছি’ কিন্তু তারা যদি আল্লাহ্র (পথে চলার) কারনে কোন ক্ষতির সম্মুখীন হয়, তখন তারা সেই পরীক্ষাকে আল্লাহ্র শাস্তি হিসেবে বিবেচনা করে, এবং যদি তোমার রবের পক্ষ থেকে সাহায্য আসে তখন তারা (মুনাফিকরা) বলে, ‘আসলে আমরা তোমার সাথেই ছিলাম’। আল্লাহ কি তার সমস্ত সৃষ্টির অন্তরের গোপন বিষয় সম্পর্কে সবচেয়ে ভালোভাবে সচেতন নন ?
وَلَيَعْلَمَنَّ اللَّـهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْمُنَافِقِينَ
(১১) এবং আল্লাহ সুনিশ্চিতভাবে জানেন কারা ঈমান এনেছে আর সুনিশ্চিতভাবে জানেন কারা মুনাফিক।”
(সূরা আনকাবুত, ২৯ :১-১১)
তাফসির
মহান আল্লাহ বলেন,
أَمْ حَسِبْتُمْ أَن تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَأْتِكُم مَّثَلُ الَّذِينَ خَلَوْا مِن قَبْلِكُم ۖ مَّسَّتْهُمُ الْبَأْسَاءُ وَالضَّرَّاءُ وَزُلْزِلُوا حَتَّىٰ يَقُولَ الرَّسُولُ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ مَتَىٰ نَصْرُ اللَّـهِ ۗ أَلَا إِنَّ نَصْرَ اللَّـهِ قَرِيبٌ
“তোমরা কি মনে করেছ যে তোমরা কোন পরীক্ষা দেওয়া ছাড়াই জান্নাতে প্রবেশ করবে যেমনটি তোমাদের পূর্বের লোকদের পরীক্ষা করা হয়েছিলো ? তার কঠোর দারিদ্রতা ও মুশকিল দ্বারা ব্যথিত হয়েছিলো এবং এমনভাবে প্রকম্পিত হয়েছিলো যে এমনকি রসুল ও তার সাথে থাকা ইমানদারগণ বলে উঠেছিল, ‘আল্লাহ্র সাহায্য কখন আসবে?’ হ্যাঁ ! নিঃসন্দেহে আল্লাহ্র সাহায্য নিকটেই।” (সূরা বাকারা, ২ :২১৪)
আল্লাহ তার বাণীতে উল্লেখ করেছেন যে কে দ্বীন ত্যাগ করেছে এবং কে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেছে,
مَن كَفَرَ بِاللَّـهِ مِن بَعْدِ إِيمَانِهِ
“যে ব্যক্তি আল্লাহ্র উপর বিশ্বাস আনার পর কুফরি করে…” (সুরা নাহল, ১৬ : ১০৬)
এরপর আল্লাহ বলেছেন,
ثُمَّ إِنَّ رَبَّكَ لِلَّذِينَ هَاجَرُوا مِن بَعْدِ مَا فُتِنُوا ثُمَّ جَاهَدُوا وَصَبَرُوا إِنَّ رَبَّكَ مِن بَعْدِهَا لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ
“অতপর যারা (ঈমানের পথে) নির্যাতিত হওয়ার পর হিজরত করে, অতপর (আল্লাহ্র পথে) জিহাদ করে এবং সবর অবলম্বন করে, নিঃসন্দেহে এ (পরীক্ষা)’র পর তোমার রব তাদের প্রতি ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু (হবেন)।” (সুরা নাহল, ১৬ :১১০)
লোকেরা আল্লাহ্র পাঠানো রসূলদের এই দুইটির মধ্যে কোন একটি উপায়ে গ্রহণ করেঃ
হয় তারা বলে ‘আমরা ঈমান আনলাম’; অথবা তারা এটা বলতে প্রত্যাখ্যান করে এবং পাপ কাজ চালু রাখে।
তাদের মধ্যে যারা বলে ‘আমি ঈমান আনলাম’, আল্লাহ তাকে পরীক্ষা করেন এবং তাকে তার পথ নির্বাচনে ঠেলে দেন যাতে করে এটা প্রকাশ হয়ে পড়ে যে সে সত্যবাদীদের (ঈমানের ব্যাপারে) মধ্যে অবস্থান করা মিথ্যাবাদী (মুনাফিক) কিনা।
যারা এটা বলা (অর্থাৎ – আমরা ঈমান আনলাম) প্রত্যাখ্যান করে, তাদের এটা মনে করা উচিত নয় যে তারা আল্লাহ্কে পরাজিত করতে পারবে, কারন এমন কেউই নেই যে সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহ্কে পরাজিত করতে পারে।
এটাই তার পথ – তিনি তার সৃষ্টির কাছে তার রসূলদের পাঠান এবং এরপর লোকেরা তার রসূলদের মিথ্যুক বলে অভিযুক্ত করে আর তাদের ক্ষতি করে। আল্লাহ বলেন,
وَكَذَٰلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِيٍّ عَدُوًّا شَيَاطِينَ الْإِنسِ وَالْجِنِّ
“এবং এভাবে আমি প্রত্যেক নবীর জন্য শত্রু নিযুক্ত করে দিয়েছি, (তারা হল) মানুষ ও জীনদের মধ্যে থেকে শয়তান …” (সূরা আনআম, ৬ :১১২)
كَذَٰلِكَ مَا أَتَى الَّذِينَ مِن قَبْلِهِم مِّن رَّسُولٍ إِلَّا قَالُوا سَاحِرٌ أَوْ مَجْنُونٌ
“অনুরূপভাবে তাদের আগে এমন কোন রসুল আসেন নি যাদের বলা হয়েছিলো তারা (রসূলরা) জাদুকর অথবা পাগল …” (সূরা আয যারিয়াত, ৫১ :৫২)
مَّا يُقَالُ لَكَ إِلَّا مَا قَدْ قِيلَ لِلرُّسُلِ مِن قَبْلِكَ
“তোমার সম্পর্কে যা বলা হচ্ছে তা তোমার আগের রসূলদের সম্পর্কেও বলা হয়েছিলো ….” (সূরা ফুসসিলাত, ৪১ : ৪৩)
এই ধরনের পাপিষ্ঠ লোকেরা তাদেরও ক্ষতি করেছিলো এবং শত্রুতা প্রকাশ করেছিলো, যারা তাদের রসূলদের বিশ্বাস ও আনুগত্য করতো। তারা সেসব ইমানদারদের কষ্ট দেওয়ার মাধ্যমে নিপীড়িত করতো এবং ইমানদাররা তাদের কথা বিশ্বাস না করলে তাদের শাস্তি দেওয়া হতো, যার ফলে তাদের জীবন আরও কষ্টকর হয়ে যেত।
কোন সন্দেহ নেই যে, প্রতিটি মানুষকেই কষ্টে ভুগতে হবে – হোক সে মুমিন অথবা কাফির। কিন্তু মুমিনরা এই দুনিয়ার ছোট্ট জীবনটাতে কষ্টভোগ করে থাকে এবং অতপর পরকালের জীবনে পুরস্কৃত হয়ে থাকে। আর কাফির লোকেরা এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়া উপভোগে মশগুল থাকে কিন্তু এরপরই যখন পরকালের অসীম যাত্রা শুরু হয়, তখন তার অসহনীয় কষ্টকর জীবন শুরু হয়।
দুর্দশা ও কতৃত্ব প্রদানের ব্যাপারে ইমাম শাফিঈ’র মত
এক ব্যক্তি ইমাম শাফিই কে জিজ্ঞেস করলো, “হে আবু আবদুল্লাহ, একজন মানুষের জন্য কোনটা উত্তম –দুর্দশাগ্রস্ত হওয়া নাকি কতৃত্ব ?” ইমাম শাফিঈ বললেন, “দুর্দশাগ্রস্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত ব্যক্তিকে কতৃত্ব প্রদান করা হয় না, আল্লাহ দুর্দশাগ্রস্ত করেছিলেন নুহ (আঃ), ইবরাহীম (আঃ), মুসা (আঃ), ঈসা (আঃ) এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম) কে – তারা সবাই ছিলেন সবরের উপর অবিচল এবং আল্লাহ তাদেরকে কতৃত্ব প্রদান করলেন। কারো একথা মনে করা উচিত নয় যে সে চিরদিনের জন্য কস্ট এড়িয়ে যেতে সক্ষম হবে।”
যারা আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করে এবং এর ফলে লোকজন অসন্তুস্ট হয়
কতৃত্বের একটি বিশাল উৎস যা একজন বুদ্ধিমান মানুষ মাত্রই জানেন সেটা হল – মানুষের একটি প্রকৃতি হল সে সভ্য হতে চায়, সে মানুষের সাথে বাস করতে চায়; আর মানুষের রয়েছে কিছু ইচ্ছা ও কিছু চিন্তা এবং তাদের সাথে সব ব্যাপারেই সম্মত থাকার দাবী । সে যদি সম্মত না হয় তবে তারা তার ক্ষতি করবে, তাকে নির্যাতন করবে এবং সে যদি তাদের সাথে সম্মত থাকে তবে সে তাদের পক্ষ থেকে ও অন্যান্যদের পক্ষ থেকে ক্ষতি ও নির্যাতনের সম্মুখীন হবে।
যে-ই তার এবং অন্য লোকদের অবস্থার ব্যাপারে চিন্তা করবে, সে এই ধরনের আরও অনেক অবস্থা দেখতে পাবে। প্রত্যেক জাতি যারা ব্যাভিচার করতে চায়, অন্যায় করতে চায় এবং দ্বীন বাতিল করতে চায়, তারা সেসব নিষিদ্ধ কাজের কারনে অপরাধী, যেগুলো আল্লাহ কুরআনের এই আয়াতে আমাদের জানিয়ে দিয়েছেনঃ
قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَن تُشْرِكُوا بِاللَّـهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَأَن تَقُولُوا عَلَى اللَّـهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ
“বলঃ ‘আমার রব যা কিছু হারাম করেছেন তা হল আল ফাওাহিশ (বড় ধরনের গুনাহ, বিশেষ করে প্রত্যেক প্রকারের অনৈতিক যৌন আচরণ ইত্যাদি) তা গোপনে বা প্রকাশ্যেই করা হোক, পাপ (সব ধরনের), অন্যায়ভাবে অত্যাচার করা, আল্লাহ্র সাথে অন্য কিছু শরীক হিসেবে যোগ করা যার ব্যাপারে তাদের কোন অনুমতি দেওয়া হয়নি এবং আল্লাহ্র সম্পর্কে এমন কিছু বলা যার ব্যাপারে তোমার কোন জ্ঞান নেই।’ ” (সূরা আল আরাফ, ৭ : ৩৩)
যদি এই ধরনের মানুষগুলো এক স্থানে একত্রিত হয়, যেমনঃ বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্রামাগার, স্কুল, গ্রাম অথবা শহরে যেখানে তাদের সাথে আরও অনেকে আছে, তারা কি করতে পারে ? তারা অন্যদের সমর্থন দেওয়া অথবা অন্যদের ক্ষেত্রে নীরব ভুমিকা পালন করা ছাড়া এবং প্রকাশ্যে বিরোধিতা করা ছাড়া আর কি করতে চাবে ? যদি অন্যরা শান্তিপূর্ণ ভুমিকায় থাকে তবে তবে তারা হয়তো বা তাদের পাপের কারনে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না কিন্তু তারা হয়তো তাদেরকে অপমান করতে পারে এবং তাদের দমিয়ে রাখার জন্য শাস্তি দিতে পারে তাদেরই এলাকাতে। তাকে হয়তো মিথ্যা শপথ বা শপথ ভঙ্গ করতে বলা হতে পারে বা দ্বীন সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলতে বলা হতে পারে অথবা অথবা ব্যাভিচার ও অন্যায় কাজ করতে বলা হতে পারে। সে যদি প্রত্যাখ্যান করে তবে তারা তার ক্ষতি করবে এবং তার প্রতি শত্রুতা প্রদর্শন করবে ; আর যদি সে তাদের জবাব দেয় তবে তারা নিজেরাই শাসন করবে, ক্ষতি করবে এবং অপমান করবে তাকে ভয় প্রদর্শনের জন্য (পূর্বের মতো) অথবা তাকে নির্যাতন করা হবে।
হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদিসে (যা তিনি মুওাওিয়া’র কাছে বর্ণনা করেছেন) যা উল্লেখ আছে সেটাই করতে হবে। এই বর্ণনাটি মাওকুফ ও মারফু’ হিসেবে বর্ণনা করা আছেঃ
“যে ব্যক্তি মানুষকে অসন্তুষ্ট করার মাধ্যমে আল্লাহ্কে খুশী করে, আল্লাহ তাকে রক্ষা করবেন তার ব্যাপারে মানুষের কাছে জিজ্ঞেস করা থেকে।” (তিরমিযি, হাদিস নং ২৪১৪)
এবং অন্য বর্ণনায় বলা আছে, “আল্লাহ তার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হবেন এবং মানুষকে তার ব্যাপারে সন্তুষ্ট করাবেন এবং যে ব্যক্তি মানুষকে সন্তুষ্ট করার মাধ্যমে আল্লাহ্কে অসন্তুস্ট করে, তারা তাকে কখনোই আল্লাহ থেকে (তার আযাব থেকে) রক্ষা করতে পারবে না।”
এটি তাদের ব্যাপারে প্রযোজ্য যারা খারাপ উদ্দেশ্যে শাসক ও নেতাদের সমর্থন করে, যারা বিদআতি লোকদের তাদের বিদআতের ব্যাপারে সমর্থন করে, যাদের কিনা জ্ঞানী ব্যক্তি ও ধার্মিক ব্যক্তি বলে মনে করা হয়।
যাকে আল্লাহ হিদায়াত দান করেন এবং সরল পথ দেখান, সে কখনোই হারাম কাজ করবে না এবং সেগুলোর ক্ষতি স্বীকার করবে আর সেগুলোর প্রতি বিরোধিতা পোষণ করবে, ফলে সে পরকালে আল্লাহ্র ইচ্ছায় তার প্রচেষ্টার প্রতিদান পাবে। কারন এটি ঘটেছিল আল্লাহ্র রসূলদের ও তাদের অনুসারীদের ক্ষেত্রে যাদের ক্ষতি করা হয়েছিলো এবং তাদের প্রতি শত্রুতা প্রকাশ করা হয়েছিলো; এই উম্মাহর মুহাজির, বিজ্ঞানী, ইবাদতকারী, ব্যাবসায়ী ও দ্বীনের সাহায্যকারীদের মতো যারা দুর্দশাগ্রস্থ হয়েছিলেন।
দুর্দশাগ্রস্থ হওয়া অবধারিত ব্যাপার
কিছু নির্দিষ্ট ঘটনার ক্ষেত্রে, সমর্থন প্রদর্শন করা আর অস্বীকৃতি গোপন করা বৈধ, সেই ব্যক্তির ঘটনার মতো যাকে অস্বীকৃতি (কুফরি) মূলক শব্দ উচ্চারনে বাধ্য করা হয়েছে। এখানে যা বুঝানো হয়েছে তা হল এটি অবধারিত যে প্রত্যেকেই দুর্দশা ও ক্ষতির মুখোমুখি হবে। দুর্দশামুক্ত হওয়ার কোন উপায় নেই।
তাই মহান আল্লাহ এই পয়েন্টটি বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করেছেন এটি বলার মাধ্যমে যে মানুষকে দুর্দশার মুখোমুখি হতে হবে এবং এই দুর্দশা সুখ অথবা দুঃখের মধ্য দিয়ে হতে পারে।। মানুষকে যেটা সন্তুষ্ট করে আর ক্ষতি করে তা দিয়েই তাকে দুর্দশার সম্মুখীন হতে হবে, তাই তাকে সবর অবলম্বন করতে হবে এবং আল্লাহ্র প্রশংশা করতে হবে। আল্লাহ বলেন,
إِنَّا جَعَلْنَا مَا عَلَى الْأَرْضِ زِينَةً لَّهَا لِنَبْلُوَهُمْ أَيُّهُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا
“যা কিছু এ জমিনের বুকে আছে আমি তাকে তার জন্য শোভা বর্ধনকারী করে পয়দা করেছি, যাতে করে তাদের (মানবজাতিকে) আমি পরীক্ষা করতে পারি যে তাদের মধ্যে আমলে কে শ্রেষ্ঠ।” (সূরা আল কাহফ, ১৮ :৭)
وَبَلَوْنَاهُم بِالْحَسَنَاتِ وَالسَّيِّئَاتِ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ
“আমি তাদের পরীক্ষা করছিলাম ভাল অবস্থা ও বিপর্যয়ের মাধ্যমে যাতে করে তারা ফিরে আসে (আল্লাহ্র আনুগত্যের দিকে)।” (সূরা আল আ’রাফ, ৭ : ১৬৮)
فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُم مِّنِّي هُدًى فَمَنِ اتَّبَعَ هُدَايَ فَلَا يَضِلُّ وَلَا يَشْقَىٰ
وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَىٰ
“… অতঃপর (তোমাদের জীবন পরিচালনার জন্য) আমার কাছ থেকে হিদায়াহ (পথনির্দেশ) আসবে, এরপর যে আমার হিদায়াহ অনুসরন করবে না সে না কখনো (দুনিয়ায়) বিপথগামী হবে, না (আখিরাতে) বিষণ্ণ হবে।
কিন্তু যে-ই আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে (অর্থাৎ, না কুরআনে বিশ্বাস করবে অথবা না এর আদেশ নিষেধ মেনে চলবে, ইত্যাদি), নিঃসন্দেহে তার জন্য রয়েছে কষ্টপূর্ণ জীবন, এবং আমি তাকে পুনরুত্থান দিবসে অন্ধ করে উঠাবো।” (সূরা তোয়া হা, ২০ :১২৩-১২৪)
أَمْ حَسِبْتُمْ أَن تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَعْلَمِ اللَّـهُ الَّذِينَ جَاهَدُوا مِنكُمْ وَيَعْلَمَ الصَّابِرِينَ
“তুমি কি মনে করো যে তুমি জান্নাতে প্রবেশ করবে অথচ আল্লাহ এখনও জানিয়ে দেন নি যে তোমাদের মধ্যে কারা আল্লাহ্র পথে জিহাদ করে আর জানিয়ে দেন যে কারা সবরকারী (ধৈর্যশীল)।” (সূরা আল ইমরান, ৩ :১৪২)
সূরা আল ইমরানের এই আয়াতটি আল্লাহ এর পূর্বের সূরাতে (সূরা আল বাকারাতে) বলেছেন,
أَمْ حَسِبْتُمْ أَن تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَأْتِكُم مَّثَلُ الَّذِينَ خَلَوْا مِن قَبْلِكُم ۖ مَّسَّتْهُمُ الْبَأْسَاءُ وَالضَّرَّاءُ وَزُلْزِلُوا حَتَّىٰ يَقُولَ الرَّسُولُ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ مَتَىٰ نَصْرُ اللَّـهِ ۗ أَلَا إِنَّ نَصْرَ اللَّـهِ قَرِيبٌ
“তোমরা কি মনে করেছ যে তোমরা কোন পরীক্ষা দেওয়া ছাড়াই জান্নাতে প্রবেশ করবে যেমনটি তোমাদের পূর্বের লোকদের পরীক্ষা করা হয়েছিলো ? তার কঠোর দারিদ্রতা ও মুশকিল দ্বারা ব্যথিত হয়েছিলো এবং এমনভাবে প্রকম্পিত হয়েছিলো যে এমনকি রসুল ও তার সাথে থাকা ইমানদারগণ বলে উঠেছিল, ‘আল্লাহ্র সাহায্য কখন আসবে?’ হ্যাঁ ! নিঃসন্দেহে আল্লাহ্র সাহায্য নিকটেই।” (সূরা বাকারা, ২ :২১৪)
দুর্দশার মধ্য দিয়ে যাওয়া ছাড়া আত্মা কখনোই পরিশুদ্ধ ও আল্লাহ ভীরু হবে না। এর উদাহারন ঠিক এ ব্যাপারটির মতো যে, স্বর্ণ কখনোই বিশুদ্ধ হয় না যতক্ষণ না এর নিকৃষ্ট ধাতুগুলো অপসারিত হয়। আত্মা হল অজ্ঞ ও ন্যায়বিরুদ্ধ এবং এটিই অমঙ্গলের উৎস যা বান্দার সম্মুখীন হয়। আল্লাহ বলেন,
مَّا أَصَابَكَ مِنْ حَسَنَةٍ فَمِنَ اللَّـهِ ۖ وَمَا أَصَابَكَ مِن سَيِّئَةٍ فَمِن نَّفْسِكَ
ۚ”তোমাদের কাছে যে কল্যাণ পৌঁছায় তা আল্লাহ্র পক্ষ থেকে এবং যে অমঙ্গল তোমাদের উপর আপতিত হয় তা তোমাদের কাছ থেকে।” (সূরা আন নিসা, ৪ :৭৯)
أَوَلَمَّا أَصَابَتْكُم مُّصِيبَةٌ قَدْ أَصَبْتُم مِّثْلَيْهَا قُلْتُمْ أَنَّىٰ هَـٰذَا ۖ قُلْ هُوَ مِنْ عِندِ أَنفُسِكُمْ ۗ إِنَّ اللَّـهَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
“অথবা যখন তোমাদের উপর মুসিবত এলো তখন তোমরা বললে ‘এ বিপদ কোথা থেকে আসলো ?’ অথচ তোমরা তো দ্বিগুণ বিপদ ঘটিয়েছিলে। বল, ‘এটি তোমাদের কাছ থেকে এসেছে (তোমাদের মন্দ কর্মের কারনে)’ ” (সূরা আল ইমরান, ৩ :১৬৫)
وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَن كَثِيرٍ
“যে বিপদই তোমাদের উপর আপতিত হোক না কেন তা তোমাদের হাতের কামাই এর ফল। এবং তিনি প্রচণ্ড ক্ষমাশীল।” (সূরা আশ সূরা, ৪২ :৩০)
ذَٰلِكَ بِأَنَّ اللَّـهَ لَمْ يَكُ مُغَيِّرًا نِّعْمَةً أَنْعَمَهَا عَلَىٰ قَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ ۙ وَأَنَّ اللَّـهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
“এটা এ কারনে যে, আল্লাহ যখন কোন জাতিকে কোন নিয়ামত দান করেন তিনি ততক্ষন পর্যন্ত তার সে নিয়ামত (তাদের জন্য) বদলে দেন না যতক্ষণ না পর্যন্ত তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করে।” (সূরা আনফাল, ৮ : ৫৩)
وَإِذَا أَرَادَ اللَّـهُ بِقَوْمٍ سُوءًا فَلَا مَرَدَّ لَهُ ۚ وَمَا لَهُم مِّن دُونِهِ مِن وَالٍ
“আল্লাহ যখন কাউকে শাস্তি দিতে চান তখন তা প্রতিহত করার কেউ থাকে না, না তিনি ছাড়া তাদের কোন অভিভাবক থাকতে পারে !” (সূরা আর-রদ, ১৩ :১১)
আল্লাহ আদম (আঃ) থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন জাতির উপর তার আযাবের ঘটনা জানিয়ে দিয়েছেন। আর তা উল্লেখ করার সময় তিনি জানিয়ে দিয়েছেন যে তারা কিভাবে নিজেদের প্রতি যুলুম করেছিলো, নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাদের প্রতি অন্যায়কারী ছিলেন না। যুলুমের প্রথম স্বীকারোক্তি করেছিলেন আমাদের পিতামাতা, আল্লাহ বলেছেন যে তারা বলেছিলেন,
قَالَا رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
“(নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে) তারা দুজনই বলে উঠলো, ‘হে আমাদের রব, আমরা আমাদের নিজেদের উপর যুলুম করেছি, আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন তাহলে আমরা অবশ্যই চরম ক্ষতিগ্রস্তদের দলে শামিল হয়ে যাবো। ’ ” (সূরা আ’রাফ, ৭ :২৩)
আল্লাহ শয়তানকে বলেছিলেন,
لَأَمْلَأَنَّ جَهَنَّمَ مِنكَ وَمِمَّن تَبِعَكَ مِنْهُمْ أَجْمَعِينَ
“তোকে আর তোর অনুসারীদের সবাইকে দিয়ে আমি জাহান্নাম পূর্ণ করবই।” (সূরা সাদ, ৩৮ :৮৫)
আর শয়তান বলল,
قَالَ رَبِّ بِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأُزَيِّنَنَّ لَهُمْ فِي الْأَرْضِ وَلَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ ﴿٣٩﴾ إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ
“সে বলল, ‘হে আমার রব, আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন (নোটঃ শয়তান এভাবে সরাসরি আল্লাহ্কে দোষ দিলো নিজের পথভ্রষ্টতার জন্য) তাই আমি নিশ্চয়ই দুনিয়াতে তাদের জন্য (মানবজাতি) ভুল পথকে সুশোভিত করে দিবো এবং আমি সবাইকে পথভ্রষ্ট করে দিবো (তবে) তাদেরকে ছাড়া, যারা ইখলাসের (একনিষ্ঠতার) সাথে আপনার ইবাদাত করবে। ’ ” (সূরা আল হিজর, ১৫ :৩৯-৪০)
আল্লাহ বললেন,
إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانٌ إِلَّا مَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْغَاوِينَ
“এ পথভ্রষ্ট মানুষদের মধ্যে যারা তোমার অনুসরন করবে তারা ছাড়া আমার বান্দাদের উপর তোমার কোন কতৃত্ব চলবে না।” (সূরা আল হিজর, ১৫ :৪২)
আমাদের পূর্ববর্তী সম্মানিত ধার্মিক ব্যক্তিগণ (সালাফগণ) স্বীকার করেছেন যে এর প্রকৃত অবস্থা হল আবু বকর (রাঃ), উমর (রাঃ) আর ইবন মাসউদ (রাঃ) যা বলেছেন – “আমি এই বিষয়ে আমার যে মতামত দিচ্ছি, তা যদি সঠিক হয় তবে সেটা আল্লাহ্র পক্ষ থেকে মঞ্জুর করা, আর যদি তা ভুল হয়ে থাকে তবে সেটা আমার পক্ষ থেকে ।”
আবু যর (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন যে আল্লাহ বলেছেন, “……. হে আমার বান্দারা ! এ তো তোমাদের আমলেরই ফলাফল। আমি তোমাদের জন্য তা হিসেব করে রেখেছি। অতঃপর আমি তোমাদেরকে পুরোপুরিভাবে তোমাদের আমলের প্রতিফল দান করবো। অতএব, যে ভাল ফল পাবে সে যেন আল্লাহ্র প্রশংসা করে এবং যে খারাপ প্রতিফল লাভ করে সে যেন এ জন্য নিজেকেই দায়ী ও অভিযুক্ত করে।” (মুসলিম; অধ্যায় – সদ্ব্যবহার, পারস্পরিক সম্পর্ক ও শিষ্টাচার)
ইবন কায়্যিম এর কিতাব আল ফাওাইদ এর ইংলিশ ট্রান্সলেশন থেকে অনূদিত

কোন মন্তব্য নেই