Header Ads

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ। আমার ব্যক্তিগত ব্লগ সাইটে আপনাদর স্বাগতম

দারসূল হাদিস: দুনিয়াতে তুমি (এমনভাবে) থাকো, যেন তুমি একজন অপরিচিত বা একজন মুসাফির

দুনিয়াতে মুসাফিরের ন্যায় জীবন যাপন সংক্রান্ত হাদিস 



 আবদুল্লাহ বিন ‘উমার (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম) তার কাঁধ ধরে বললেন, “এ দুনিয়াতে তুমি (এমনভাবে) থাকো, যেন তুমি একজন অপরিচিত বা একজন মুসাফির।”

ইবনে ‘উমার (রাঃ) বলতেন, “যদি তুমি সন্ধ্যা পর্যন্ত বেঁচে থাকো, তবে সকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকার আশা করো না। যদি তুমি সকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকো, তবে সন্ধ্যার প্রত্যাশা করো না। সুস্থ থাকা অবস্থায় তুমি অসুস্থতার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করো, আর বেঁচে থাকা অবস্থায় নিজেকে প্রস্তুত করো মৃত্যুর জন্য।”

(সাহিহ বুখারি – কিতাবুর রিকাক, হাদিস ৬৪১৬)

 

হাদিসটির ব্যাখ্যা

 

দীর্ঘ জীবনের আশা ছোট করা

 

এই হাদিসটি দীর্ঘ জীবনের আশা ছোট করার সাথে সম্পর্কিত। একজন মুমিনের এটা মনে করা উচিত নয় যে, সে এই দুনিয়াতে অনন্তকাল বেঁচে থাকবে, বরং তার তো কেবল একজন মুসাফিরের মতোই হওয়া উচিত। সকল নবীগণ আর তাদের অনুসারীগণ এ ব্যাপারে একমত। মহান আল্লাহ বলেন,

 

يَا قَوْمِ إِنَّمَا هَـٰذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا مَتَاعٌ وَإِنَّ الْآخِرَةَ هِيَ دَارُ الْقَرَارِ ﴿٣٩﴾

“হে আমার জাতি, দুনিয়ার এ জীবন তো কেবল উপভোগের বস্তু, নিঃসন্দেহে পরকালই হল স্থায়ী বসবাসের আবাস।” (সূরাহ গাফির, ৪০ :৩৯)

 

রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “দুনিয়ার সাথে আমার কি ? দুনিয়া আর আমার সম্পর্ক হল (এমন যে), আমি তো কেবল একজন আরোহীর মতোই, যে কিনা একটি গাছের ছায়ার নিচে বসে, এরপর সে তা ছেড়ে চলে যায়।” (তিরমিযি – হাদিস ২৩৭৭, ইবনে মাজাহ – হাদিস ৪১০৯, মুসনাদে আহমাদ – হাদিস ১/৩৯১)

এক ব্যক্তি আবু যার (রাঃ) এর বাসায় গিয়ে তার বাসা দেখতে লাগলেন। এরপর তিনি বললেন, “হে আবু যার, আপনার আসবাবপত্র কই ?” আবু যার (রাঃ) বললেন, “আমাদেরকে তো আরেকটি বাড়িতে যেতে হবে।” লোকটি বললেন, “যেহেতু আপনি এখানে আছেন, তাই আসবাবপত্র তো অবশ্যই থাকতে হবে।” আবু যার (রাঃ) বললেন, “বাড়ির মালিক আমাদেরকে এখানে থাকতে দিবেন না।

কিছু লোক এক ধার্মিক ব্যক্তির বাড়িতে প্রবেশ করে বাড়িটি দেখে বললেন, “আপনার বাড়ি তো একজন মুসাফিরের বাড়ির মতোই।” তিনি বললেন, “আমি তো সফর করবো না, আমি বিদায় নিবো।”

আলি বিন আবু তালিব (রাঃ) বলেছেন, “দুনিয়া অতিক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে আর পরকাল চলে আসছে। এদের প্রত্যেকেরই পুত্র আছে। পরকালের পুত্র হও, কখনো এই দুনিয়ার পুত্র হয়ো না। আজ তো তুমি আমল করছো, এর জন্য তোমাকে জবাবদিহিতা করতে হচ্ছে না; কিন্তু কাল তোমাকে জবাবদিহিতা করতে হবে, তখন তুমি আর আমল করতে পারবে না।”

 

এই দুনিয়াতে মুমিনের অবস্থা

 

যদি একজন মুমিন জেনে থাকে যে, এই দুনিয়াতে সে অনন্তকাল জীবনযাপন করবে না, তবে তার উচিত হবে বিদেশে থাকা সেই অপরিচিত ব্যক্তির মতো এই দুনিয়াতে অবস্থান করা, যে ব্যক্তি তার ঘরে ফিরে যাওয়ার লক্ষ্যে তার ভ্রমণকালীন জিনিষপত্র প্রস্তুত করছে; অথবা একজন সফরকারী ব্যক্তির মত অবস্থান করা, যে ব্যক্তি তার গন্তব্যে পৌঁছার জন্য দিন-রাত হেঁটে যাচ্ছে।

রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম) ইবন ‘উমার (রাঃ) কে এই দুটোর কোন একটি হওয়ার উপদেশ দিয়েছিলেন।

প্রথম উদাহারনটির ব্যাপারে বলা যায়, একজন মুমিন তো বিদেশে অবস্থান করা ঠিক একজন অপরিচিত ব্যাক্তির মতোই, মাতৃভূমির সাথে যার অন্তর লেগে থাকা উচিত। সে তার বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য তার ভ্রমণকালীন জিনিসপত্র প্রস্তুত করার কাজে ব্যস্ত।

ফুদাইল বিন ‘ইয়াদ বলেছেন, “এই দুনিয়াতে একজন মুমিন বিষণ্ণ ও চিন্তিত থাকে। নিজেকে পরকালের জন্য প্রস্তুত করা ছাড়া তার আর কোন লক্ষ্যই থাকে না।”

এ ক্ষেত্রে মুমিন ব্যক্তি সেই ভিনদেশের বাসিন্দাদের সাথে প্রতিযোগীতা করবে না, আর না সে তাদের কাছে নিজেকে হীন করবে।

আল-হাসান বলেছেন, “একজন মুমিন তো ঠিক একজন অপরিচিত ব্যক্তির মতোই। সে নিজেকে অপর লোকদের কাছে হীন করে না, আর না সে পার্থিব লাভের জন্য তাদের সাথে প্রতিযোগীতা করে। তার জন্য আছে তার নিজস্ব করণীয় কাজ, আর লোকদের জন্যও আছে তাদের নিজস্ব করণীয় কাজ।”

দ্বিতীয় উদাহারনটির ব্যাপারে বলা যায়, মুমিন ব্যক্তিটি নিজেকে একজন মুসাফির হিসেবে বিবেচনা করবেন, যার শেষ গন্তব্য হল পরকাল। অন্তরে এই গন্তব্য ঠিক করার মাধ্যমে মুমিন ব্যক্তিটি সফরের জন্য কেবল প্রয়োজনীয় চাহিদাগুলোই অর্জন করবেন। তিনি পার্থিব আনন্দের ব্যাপারে মোটেই পরোয়া করবেন না। এ কারনে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম) বেশ কিছু সাহাবীদেরকে একজন মুসাফিরের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র ছাড়া দুনিয়ার আর কোন কিছুর অধিকারী না হওয়ার ব্যাপারে উপদেশ দিয়েছিলেন। (যেমনটি উপদেশ দিয়েছিলেন ইবন ‘উমার (রাঃ) কে, যা হাদিসটিতে উল্লেখ করা হয়েছে)।

মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি’কে জিজ্ঞেস করা হলো, “আজ আপনি কেমন আছেন ?” তিনি জবাব দিলেন, “সেই ব্যক্তি সম্পর্কে তুমি কি মনে করো, যে কিনা প্রতিটা দিনই পরকালের দিকে সফর করছে ?”

আল-হাসান বলেছেন, “তুমি তো দিনগুলোর চেয়ে বেশী কিছু না। যখন একটি দিন অতিক্রম করে, তোমাদের মধ্যে কিছু লোক সেই দিনগুলোর সাথেই অতিক্রান্ত হয়ে যায় (দুনিয়ার জীবন অতিক্রম করে পরকালে যাত্রার মাধ্যমে)।”

তিনি আরো বলেছেন, “হে আদম সন্তান, দুটো প্রাণীর উপর তোমরা সওয়ার হয়ে আছো, এগুলো হল দিন আর রাত। রাত তোমাদেরকে দিনের কাছে হস্তান্তর করে আর দিন তোমাদেরকে রাতের কাছে হস্তান্তর করে, এমনটি চলতে থাকে যতক্ষণ না পর্যন্ত তোমরা পরকালের কাছে হস্তান্তর হয়ে যাও। হে আদম সন্তান, তোমাদের কাছে কে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ?”

তিনি আরো বলেছেন, “মৃত্যু তোমার গন্তব্য, আর এই দুনিয়ার তো সমাপ্তির ঘটবে।”

ফুদাইল বিন ‘ইয়াদ এক ব্যক্তিকে বললেন, “আপনার বয়স কতো ?” ব্যক্তিটি জবাব দিলেন, “ষাট বছর।” ফুদাইল বললেন, “ষাট বছর ধরে আপনি আপনার রবের দিকে সফর করছেন, আপনার তো গন্তব্যে পৌঁছার সময় নিকটবর্তী।” লোকটি বললেন, “আল্লাহ’র কাছেই আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে।” ফুদাইল বললেন, “আপনি কি এর ব্যাখ্যা জানেন ? যখন কোন ব্যক্তি এটা জানে যে, সে একজন গোলাম আর সে আল্লাহ’র কাছে ফিরে যাবে, সে এটাও জানে যে তাকে তার আমলের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আর যদি সে জানে যে, তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, তবে তার উচিত হবে প্রশ্নগুলোর জবাব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হওয়া।” লোকটি বললেন, “আমার কি করা উচিত ?” ফুদাইল বললেন, “এটা তো একটি সহজ বিষয় ?” লোকটি বললেন, “ সেটি কি ?” ফুদাইল বললেন, “আপনার জীবনের বাকিটা সময় আপনাকে সিরাতুল মুস্তাকিমের সাথে লেগে থাকতে হবে, এতে করে আল্লাহ আপনার অতীতের গুনাহগুলো ক্ষমা করে দিবেন। আপনি যদি বাকি জীবন গুনাহ করে যেতে থাকেন, তবে সারাজীবন আপনি যেসব গুনাহ করেছেন সেগুলোর ব্যাপারে আপনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।”

এই কথার আলোকে এক কবি বলেছেন, “কোন ব্যক্তি যদি ষাট বছর ধরে কোন গন্তব্যের দিকে হাঁটতে থাকে, তবে গন্তব্য তো খুবই নিকটবর্তী হয়ে যায়।”

একজন জ্ঞানী ব্যক্তি বলেছিলেন, “কোন ব্যক্তির সওয়ার হওয়ার প্রাণী যদি হয় দিন আর রাত, তবে সে না হাঁটলেও তারা ঠিকই তাকে সাথে নিয়ে হেঁটে যাবে।”

আরেকজন কবি বলেছিলেন,

“দিনগুলো তো মৃত্যুতেই শেষ হওয়া ধাপ ছাড়া আর বেশী কিছু নয়,

গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখতে পাবে এক বিস্ময়কর ব্যাপার – মুসাফির বসে আছে !”

 

ইবনে ‘উমার (রাঃ) এর উপদেশ

 

ইবনে ‘উমার (রাঃ) এর উপদেশটি বর্ণিত হাদিস থেকে পাওয়া যায়। এটিও দীর্ঘ জীবনের প্রতি আশা ছোট করার সাথে সম্পর্কযুক্ত; আর এটার সাথেও সম্পর্কযুক্ত যে – যদি কোন ব্যক্তি সন্ধ্যা পর্যন্ত বেঁচে থাকে, তবে সকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকার আশা করা উচিত নয়, যদি সকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকে তবে সন্ধ্যার প্রত্যাশা করা উচিত নয়। তার উচিত এই বিশ্বাস রাখা যে, সেই সময়ের আগেই সে মারা যেতে পারে। অনেক আলিম এই উপদেশের আলোকে যুহদকে ব্যাখ্যা করেছেন।

আল–মারওয়াজি বলেছেন, “ইমাম আহমাদকে জিজ্ঞেস করা হল, ‘দুনিয়াতে যুহদ বলতে কি বুঝায় ?’ তিনি জবাব দিলেন, ‘দীর্ঘ জীবনের আশা ছোট করা; এবং যদি কেউ সন্ধ্যা পর্যন্ত বেঁচে থাকে তবে তার সকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকার আশা করা না করা, আর সকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকলে সন্ধ্যার প্রত্যাশা না করা। এটা সুফিয়ানেরও মত।’ ”

ইমাম আহমাদকে আরো জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, “একজন ব্যক্তি কিভাবে দীর্ঘ জীবনের প্রতি আশা ছোট করতে পারে ?” তিনি জবাব দিয়েছিলেন, “সেটা আমি জানি না। এটি তো আল্লাহ’র পক্ষ থেকে হিদায়াত।”

আল-হাসান বলেছিলেন, “একবার তিনজন আলিমের সাক্ষাৎ হল। তাদের একজন আরেকজনকে বললেন, ‘আপনি কি পরিমাণ সময় বেঁচে থাকার আশা করেন ?’ তিনি জবাব দিলেন, ‘মাসের শুরুতে আমি চিন্তা করি, আমি সে মাসেই মারা যাবো।’ অপর দুজন আলিম বললেন, ‘আসলে এটিই তো জীবনে ছোট্ট আশা।’ এরপর তারা তাদের মধ্যকার অপরজনকে বললেন, ‘আপনি কি পরিমাণ সময় বেঁচে থাকার আশা করেন ?’ তিনি জবাব দিলেন, ‘সপ্তাহের শুরুতে আমি চিন্তা করি, আমি সে সপ্তাহেই মারা যাবো।’ অপর দুজন আলিম বললেন, ‘এটিই আসলে জীবনে ছোট্ট আশা।’ এরপর তারা তাদের মধ্যকার আরেকজনকে বললেন, ‘আপনি কি পরিমাণ সময় বেঁচে থাকার আশা করেন ?’ তিনি জবাব দিলেন, ‘যে ব্যক্তির আত্মার মালিকানা অন্য কারো কাছে রয়েছে, তার আবার এ ব্যাপারে আশা কি থাকতে পারে ?’ ”

দাউদ আত-তাঈ বলেছেন, “আমি আতওয়ান বিন আমর আত-তাইমিকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘জীবনে ছোট আশা কোনটি ?’ তিনি জবাব দিলেন, ‘সেটা তো দুটো নিঃশ্বাসের মাঝে রয়েছে।’ এরপর আমি ফুদাইল বিন ইয়াদকে তার এ কথাটা জানালে তিনি কাঁদলেন আর বললেন, ‘তিনি একবার নিঃশ্বাস নিয়ে ভয় করলেন যে তিনি দ্বিতীয়বার নিঃশ্বাস গ্রহণ করতে পারবেন না; আতওয়ান বিন আমর তো মৃত্যুর জন্য সত্যিই খুব প্রস্তুত।’ ”

একজন আলিম বলেছিলেন, “আমি ঘুম থেকে উঠতে পারবো না – এটা চিন্তা করা ছাড়া আমি কখনোই ঘুমোই নি।”

 

ইবনে উমার (রাঃ) বলেছেন, “সুস্থতার সময় তুমি অসুস্থতার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করো, আর বেঁচে থাকার সময়টাতে নিজেকে প্রস্তুত করো মৃত্যুর জন্য।”

এর অর্থ হল, একজন ব্যক্তির উচিত মৃত্যুর পূর্বে সুস্থতার সময়টাতে সৎ কাজ করা। এই উপদেশটি আরেকটি হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “এমন দুটো নিয়ামত আছে, যে দুটোতে অনেক মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত, সেগুলো হলো – সুস্থতা আর অবসর (সময়)।” (বুখারি – কিতাবুর রিকাক, হাদিস ৬৪১২)

ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে তিনি রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম) কে এক ব্যক্তিকে নসিহত দিতে শুনেছিলেন, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে বলছিলেন, “পাঁচটি ঘটনার আগেই পাঁচটি সুযোগের সদ্ব্যবহার করো – তোমার বৃদ্ধ বয়সের আগে যৌবনকালকে, অসুস্থতার পূর্বে সুস্থতাকে, দারিদ্রতার পূর্বে ঐশ্বর্যকে, ব্যস্ততার পূর্বে অবসর সময়কে এবং মৃত্যুর পূর্বে তোমার জীবনকে।” (মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস ৪/৩০৬; আয-যাহাবি এর বিশুদ্ধতা প্রমাণ করেছেন)

গুনাইম বিন কায়েস বলেছেন, “ইসলামের শুরুতে আমরা একে অপরকে এটা বলে দ্বীনের দিকে আহবান করতাম – ‘হে আদম সন্তান, সৎ কাজ করো – ব্যস্ততার পূর্বেই অবসর সময়ে, বৃদ্ধ হওয়ার পূর্বে তোমার যৌবনকালে, অসুস্থতার পূর্বে সুস্থতার সময়, মৃত্যুর পূর্বে এই জীবনে আর পরকালের পূর্বে এই দুনিয়াতে।”

আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “ছয়টি বিষয় ঘটবার পূর্বেই সৎ কাজের ব্যাপারে দ্রুত অগ্রসর হও – পশ্চিম থেকে সূর্যোদয়, ধোঁয়া, দাজ্জাল, অদ্ভুত প্রাণী, মৃত্যু, মহাপ্রলয়।”

এটা এই অর্থ প্রকাশ করে যে, অনুরূপ বিষয়গুলো একজন ব্যক্তিকে সৎ কাজে বাধা দেয়; হতে পারে সে বিষয়গুলো একজন ব্যক্তির নিজস্ব কোন বিষয়, যেমন – দারিদ্রতা, অসুস্থতা, বৃদ্ধ বয়স বা মৃত্যু, অথবা হতে পারে সেটি ব্যাপক কোন বিষয়, যেমন – পুনরুত্থান, দাজ্জাল ও ফিতনা।

রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম) আরো বলেছেন, “রাতের অন্ধকারতম অংশের মতো অন্ধকার ফিতনার পূর্বেই সৎ কাজ করার ব্যাপারে দ্রুত অগ্রসর হও।” (মুসলিম – কিতাবুল ফিতান, হাদিস ১২৮/২৯৪৭)

কিছু ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর কোন সৎ কাজই উপকারে আসবে না, যেমনটি আল্লাহ বলেছেন –

 

يَوْمَ يَأْتِي بَعْضُ آيَاتِ رَبِّكَ لَا يَنفَعُ نَفْسًا إِيمَانُهَا لَمْ تَكُنْ آمَنَتْ مِن قَبْلُ أَوْ كَسَبَتْ فِي إِيمَانِهَا خَيْرًا ۗ

“যেদিন তোমার রবের কিছু নিদর্শন প্রকাশ হবে, সেদিনের পূর্বে যারা ঈমান আনেনি, তাদের তখন ঈমান আনাতে কোন উপকার হবে না, অথবা যারা নিজেদের ঈমান দিয়ে কোন সৎ কাজ করেনি (তখন সৎ কাজ দিয়ে কোন ফলোদয় হবে না) … ” (সূরাহ আল-আন’আম, ৬ :১৫৮)

 

আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “পশ্চিম থেকে সূর্য উদিত হওয়ার আগ পর্যন্ত কিয়ামাত হবে না। এরপর যখন পশ্চিম আকাশ থেকে সূর্য উদিত হবে, তখন সব মানুষই আল্লাহ’র উপর ঈমান আনবে। কিন্তু এর পূর্বে যে ব্যক্তি ঈমান আনেনি বা ঈমানের সাথে সৎ কাজ করেনি, সে ঈমান তার কোন উপকারে আসবে না।” (বুখারি – কিতাবুর রিকাক, হাদিস ৬৫০৬; মুসলিম – কিতাবুল ঈমান, হাদিস ১৫৭)

রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম) আরো বলেছেন, “যখন তিনটি নিদর্শন প্রকাশ পাবে তখন কোনো ব্যক্তির ঈমান তার উপকারে আসবে না, যদি সে এর পূর্বে ঈমান না এনে থাকে অথবা ঈমানের সাথে কোন নেক আমল সঞ্চয় না করে থাকে, (নিদর্শন তিনটি হল) – পশ্চিম আকাশ থেকে সূর্য উদিত হওয়া, দাজ্জালের আবির্ভাব আর দাব্বাতুল আরদ্‌ বা জমিন থেকে একটি জন্তুর আবির্ভাব।” (মুসলিম – কিতাবিল ঈমান, হাদিস ১৫৮)

রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম) আরো বলেছেন, “যদি একজন ব্যক্তি পশ্চিম থেকে সূর্য উঠার পূর্বেই তাওবা করে, তবে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিবেন।” (মুসলিম – কিতাবুয যিকর ওয়াদ-দুয়া, হাদিস ৪৩/২৭০৩)

আবু মুসা আশয়ারি (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “মহান আল্লাহ রাতে নিজ হাতকে প্রসারিত করেন, যাতে করে দিনের পাপকারী বান্দা তাওবা করে; আর দিনে নিজ হাত প্রসারিত করেন যাতে রাতে পাপকারী বান্দা তাওবা করে – (এমনটি হতে থাকবে) যে পর্যন্ত না পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হয়।” (মুসলিম – কিতাবুত তাওবা, হাদিস ৩১/২৭৫৯)

 

অসুস্থতা, মৃত্যু বা এই নিদর্শনগুলোর কোন একটি নিদর্শন সৎ কাজ করা থেকে বিরত করার পূর্বেই একজন মুমিনের উচিত সৎ কাজ করার ব্যাপারে দ্রুত অগ্রসর হওয়া।

আবু হাযিম বলেন, “সব লোকই পরকালের মাল বিক্রি করে দেয় না; যারা পরকালের মাল খরচ করে ফেলে, তারা কেউই পরকালের কোন মাল কিনতে সক্ষম হয় না।”

একজন ব্যক্তি যদি সৎ কাজ না করে তবে তার তো উচিত অনুতপ্ত হওয়া, আর যে অবস্থায় সে সৎ কাজ করতে পারবে সে অবস্থায় ফিরে যাওয়ার জন্য আকাংখা করা। আল্লাহ বলেছেন,

 

وَأَنِيبُوا إِلَىٰ رَبِّكُمْ وَأَسْلِمُوا لَهُ مِن قَبْلِ أَن يَأْتِيَكُمُ الْعَذَابُ ثُمَّ لَا تُنصَرُونَ ﴿٥٤﴾ وَاتَّبِعُوا أَحْسَنَ مَا أُنزِلَ إِلَيْكُم مِّن رَّبِّكُم مِّن قَبْلِ أَن يَأْتِيَكُمُ الْعَذَابُ بَغْتَةً وَأَنتُمْ لَا تَشْعُرُونَ ﴿٥٥﴾ أَن تَقُولَ نَفْسٌ يَا حَسْرَتَىٰ عَلَىٰ مَا فَرَّطتُ فِي جَنبِ اللَّـهِ وَإِن كُنتُ لَمِنَ السَّاخِرِينَ ﴿٥٦﴾

أَوْ تَقُولَ لَوْ أَنَّ اللَّـهَ هَدَانِي لَكُنتُ مِنَ الْمُتَّقِينَ ﴿٥٧﴾ أَوْ تَقُولَ حِينَ تَرَى الْعَذَابَ لَوْ أَنَّ لِي كَرَّةً فَأَكُونَ مِنَ الْمُحْسِنِينَ ﴿٥٨﴾

“সুতরাং তোমরা তোমাদের রবের দিকে ফিরে আসো আর তার কাছেই (পূর্ণ) আত্মসমর্পণ করো তোমাদের উপর আল্লাহ’র আযাব আসার পূর্বেই, (কেননা একবার আযাব এসে গেলে) এরপর তোমাদের আর কোনো রকম সাহায্য করা হবে না। তোমাদের অজান্তে তোমাদের উপর অতর্কিতভাবে কোন রকম আযাব নাযিল হওয়ার পূর্বেই তোমাদের কাছে তোমাদের রব যে উৎকৃষ্ট (কিতাব) নাযিল করেছেন তোমরা তার অনুসরণ করো;

(এরপর এমন যেন না হয়,) কেউ (একদিন) বলবে, হায় আফসোস! আল্লাহ’র প্রতি আমার কর্তব্য পালনে আমি দারুন শৈথিল্য প্রদর্শন করেছি, আমি তো (মূলত) ছিলাম ঠাট্টা বিদ্রুপকারীদেরই একজন। কিংবা (কেউ) যেন একথা না বলে, যদি আল্লাহ আমাকে হিদায়াত দান করতেন, তবে আমি অবশ্যই মুত্তাকীদের দলে শামিল হয়ে যেতাম।

অথবা আযাব সামনে দেখে কেউ বলবে, আহা, যদি আমার (আবার) দুনিয়ায় পাঠিয়ে দেওয়া (নসীবে) থাকতো, তাহলে আমি সৎ কর্মশীল বান্দাদের দলে শামিল হয়ে যেতাম।” (সূরাহ আয-যুমার, ৩৯ :৫৪-৫৮)

 

حَتَّىٰ إِذَا جَاءَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ رَبِّ ارْجِعُونِ ﴿٩٩﴾ لَعَلِّي أَعْمَلُ صَالِحًا فِيمَا تَرَكْتُ ۚ كَلَّا ۚ إِنَّهَا كَلِمَةٌ هُوَ قَائِلُهَا ۖ وَمِن وَرَائِهِم بَرْزَخٌ إِلَىٰ يَوْمِ يُبْعَثُونَ ﴿١٠٠﴾

“এমনকি (এ অবস্থায় যখন) এদের কারো মৃত্যু এসে হাজির হবে, তখন সে বলবে, হে আমার রব, আপনি আমাকে (আরেকবার দুনিয়াতে) ফেরত পাঠান, যাতে করে (সেখানে গিয়ে) এমন কিছু সৎ কাজ করে আসতে পারি, যা আমি (পূর্বে) ছেড়ে এসেছি; (তখন বলা হবে,) না, তা আর কখনোই হওয়ার নয়; (মূলত) সেটা হল এক (অসম্ভব) কথা, যা সে শুধু বলার জন্যই বলবে, এ (মৃত) ব্যক্তিদের সামনে একটি যবনিকা (তাদের আড়াল করে রাখবে) সে দিন পর্যন্ত, যেদিন তারা (কবর থেকে) পুনরুত্থিত হবে।” (সূরাহ আল-মু’মিনুন, ২৩ :৯৯-১০০)

 

وَأَنفِقُوا مِن مَّا رَزَقْنَاكُم مِّن قَبْلِ أَن يَأْتِيَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ فَيَقُولَ رَبِّ لَوْلَا أَخَّرْتَنِي إِلَىٰ أَجَلٍ قَرِيبٍ فَأَصَّدَّقَ وَأَكُن مِّنَ الصَّالِحِينَ ﴿١٠﴾ وَلَن يُؤَخِّرَ اللَّـهُ نَفْسًا إِذَا جَاءَ أَجَلُهَا ۚ وَاللَّـهُ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ ﴿١١﴾

“আমি তোমাদেরকে যা কিছু অর্থ সম্পদ দিয়েছি তা থেকে তোমরা (আল্লাহ’র পথে) ব্যয় করো তোমাদের কারো মৃত্যু আসার পূর্বেই, (কেননা সামনে মৃত্যু এসে দাঁড়ালে সে বলবে,) হে আমার রব, আপনি যদি আমাকে আরও কিছু কালের  অবকাশ দিতেন তাহলে আমি আপনার পথে দান করতাম এবং (এভাবেই) আমি আপনার সৎ কর্মশীল বান্দাদের দলে শামিল হয়ে যেতাম। কিন্তু যখন কারো আল্লাহ নির্ধারিত সময় এসে যাবে, তখন আল্লাহ আর তাকে (এক মুহূর্তও) অবকাশ দিবেন না; তোমরা (দুনিয়ার জীবনে) যা কিছু করছো, আল্লাহ সে সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত আছেন।” (সূরাহ আল-মুনাফিকুন, ৬৩ :১০-১১)

 

সুতরাং একজন মুমিনের উচিত সৎ কাজ করার মাধ্যমে বাকি জীবনটা ব্যয় করা।

সাই’দ বিন যুবাইর বলেছিলেন, “একজন মুমিনের জীবনে প্রতিটা দিনই হল একটি সম্পদ।”

বাকর আল-মুযানি বলেন, “আল্লাহ’র সৃষ্টি করা প্রতিটি দিন বলে, ‘হে আদম সন্তান, আমাকে ব্যবহার করো, হয়তোবা তুমি আরেকটি দিন বেঁচে থাতে পারবে না।’ আল্লাহ’র সৃষ্টি করা প্রতিটা রাত বলে, ‘হে আদম সন্তান, আমাকে ব্যবহার করো, হয়তোবা তুমি আরেকটি রাত বেঁচে থাকতে পারবে না।’ ”

 

হাদিসের তাফসীরটি ইমাম ইবন রজব এর কিতাব জামিআল উলুম ওয়াল হিকাম এর ইংলিশ ভার্শন থেকে ট্রান্সলেশন করা হয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই

Deejpilot থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.